ভোটারের আস্থা সংকট: ইভিএম থেকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গভীরে | আই নিউজ বিডি

ভোটারের আস্থা সংকট: ইভিএম থেকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গভীরে

ড. তৌফিক এলাহী  avatar   
ড. তৌফিক এলাহী
ভোটারের আস্থা সংকট: ইভিএম থেকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গভীরে
ভোটারের আস্থা সংকট: ইভিএম থেকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গভীরে
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) কর্তৃক দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা এবং পরবর্তী সময়ে...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) কর্তৃক দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা এবং পরবর্তী সময়ে ঐতিহ্যবাহী ব্যালট পেপারে ফিরে আসার ঘোষণা জনমনে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না, বরং এটি ভোটারের আস্থা সংকট এবং সামগ্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত সমস্যাগুলির প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে, ২০২২ সালের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত ইসির উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে ইভিএমের কারিগরি সক্ষমতা ও আর্থিক ব্যয় নিয়ে যে আলোচনা হয়, তাতেই এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের বীজ নিহিত ছিল, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনায় আরও স্পষ্ট হয়।

ভোটারের আস্থা সংকটের মূল কারণ কেবল ইভিএমের ত্রুটি বা এর ব্যবহার নিয়ে জনমনে অবিশ্বাস নয়, বরং এর শেকড় আরও গভীরে প্রোথিত। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের অভাব, নির্বাচনী আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতার প্রশ্ন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ ভোটারদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, World Bank এর 'Worldwide Governance Indicators' (WGI) রিপোর্টে বাংলাদেশের 'Political Stability and Absence of Violence/Terrorism' এবং 'Voice and Accountability' সূচকগুলোতে ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনমানুষের আস্থার অভাবকে নির্দেশ করে। এই সূচকগুলো সরাসরি নির্বাচনী ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যখন ভোটাররা মনে করেন যে তাদের ভোট প্রদানের প্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ অথবা তাদের ভোটের ফল প্রভাবিত হচ্ছে, তখন তারা পুরো সিস্টেমের প্রতি বিশ্বাস হারায়। নির্বাচনী প্রচারণার সময় আচরণবিধি লঙ্ঘন, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও এই আস্থাহীনতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এমনকি, ADB (Asian Development Bank) এর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প মূল্যায়নেও সুশাসন এবং স্বচ্ছতার অভাবকে বাংলাদেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করে।

নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গভীরে এই আস্থাহীনতা কেবল ইভিএম বা ব্যালট পেপারের মতো পদ্ধতির প্রশ্ন নয়, বরং এটি সামগ্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার কাঠামো, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরপেক্ষতা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন কার্যকারিতা নিয়ে প্রায়শই সমালোচনা দেখা যায়, যেখানে অভিযোগ ওঠে যে কমিশন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারছে না। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন সময়ে প্রণীত নির্বাচনী আইন ও বিধিমালা থাকা সত্ত্বেও, সেগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিশেষ করে, নির্বাচনী পর্যবেক্ষক সংস্থার ভূমিকা, প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং নির্বাচনী অভিযোগ নিষ্পত্তিতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার প্রাপ্তির বিষয়টি এখনও চ্যালেঞ্জের মুখে। অনেক সময় দেখা যায়, নির্বাচনী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্ব বা দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়, যা একই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তিকে উৎসাহিত করে। এই সামগ্রিক চিত্রটি ভোটারদের মনে এমন এক ধারণা তৈরি করে যে, তাদের ভোট কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা, যার প্রকৃত ফল পূর্বনির্ধারিত হতে পারে। এই পরিস্থিতি গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে এবং জনগণের রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের আগ্রহ কমিয়ে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুশাসনের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে।

সূচক ২০১০ ২০১৫ ২০২০ ২০২২
World Bank WGI: Voice and Accountability (percentile rank) ২২.৬ ১৯.৭ ১৭.৩ ১৫.৫
World Bank WGI: Political Stability and Absence of Violence (percentile rank) ২৪.১ ২০.৫ ১৮.৯ ১৬.৮
ইলেকশন কমিশন বাজেট (কোটি টাকা) - ইভিএম ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণ ০ ৪০০ (প্রাথমিক ইভিএম পাইলট) ৩৮৩৪ (বৃহৎ ইভিএম প্রকল্প) ০ (ইভিএম ব্যবহার স্থগিত)

উৎস: World Bank (Worldwide Governance Indicators), বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট নথি।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে (সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং আইন মন্ত্রণালয়ের সহায়তায়) নির্বাচনী আইন, ১৯৭২ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২-এর ধারাগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে নির্বাচনী ব্যয় এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান কার্যকর করে।
  • বাংলাদেশ সরকার এবং অর্থ মন্ত্রণালয়কে World Bank ও ADB-এর সুশাসন সংক্রান্ত সুপারিশমালা অনুসরণ করে নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত তহবিল এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে কমিশন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।
  • নির্বাচন কমিশনকে (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায়) একটি জাতীয় ভোটার শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রম চালু করতে হবে, যেখানে ইভিএম বা ব্যালট পেপার যাই ব্যবহার করা হোক না কেন, ভোট প্রদানের প্রক্রিয়া, ভোটারের অধিকার এবং নির্বাচনী অনিয়ম অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করা হবে, যাতে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. তৌফিক এলাহী

ড. তৌফিক এলাহী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

نظری یافت نشد


News Card Generator