অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন: কেন দেশি বীজেই ফিরছে প্রাণের পুষ্টি? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন: কেন দেশি বীজেই ফিরছে প্রাণের পুষ্টি?

সুমাইয়া পারভীন  avatar   
সুমাইয়া পারভীন
অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন: কেন দেশি বীজেই ফিরছে প্রাণের পুষ্টি?
অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন: কেন দেশি বীজেই ফিরছে প্রাণের পুষ্টি?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেশীয় ধানের জাত, বিশেষত কালোজিরা, রাঁধু...

সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেশীয় ধানের জাত, বিশেষত কালোজিরা, রাঁধুনিপাগল ও বাঁশফুল-এর চাষাবাদে কৃষকদের আগ্রহ প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবণতা কেবল ধানে সীমাবদ্ধ নয়; BARI (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট) কর্তৃক সংরক্ষিত দেশীয় সবজি ও ফলের বীজের প্রতিও স্থানীয় কৃষকদের ঝোঁক বাড়ছে, যা এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে অর্গানিক ফার্মিং এবং পুষ্টি সুরক্ষার ক্ষেত্রে। এই পরিবর্তন ইঙ্গিত দেয় যে, আমাদের খাদ্য ব্যবস্থায় একটি মৌলিক রূপান্তর আসন্ন, যেখানে প্রাণের পুষ্টি ফিরিয়ে আনতে দেশি বীজই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আধুনিক কৃষিব্যবস্থা উচ্চ ফলনের লক্ষ্যে হাইব্রিড ও জেনেটিক্যালি মডিফাইড (GM) বীজের উপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়েছিল, যা প্রথমদিকে উৎপাদন বৃদ্ধি করলেও দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য এবং খাদ্যের পুষ্টিগুণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। BARC (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল) এর সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার মাটির অণুজীব বৈচিত্র্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যার ফলস্বরূপ ফসলের পুষ্টি উপাদান শোষণ ক্ষমতা কমে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, গত তিন দশকে আমাদের প্রচলিত খাদ্যশস্যে জিঙ্ক, আয়রন ও ভিটামিন বি কমপ্লেক্সের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, অর্গানিক ফার্মিং এবং দেশি বীজের পুনরুত্থান কেবল একটি বিকল্প নয়, বরং পরিবেশ-বান্ধব ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদনের এক অপরিহার্য পথ। দেশি জাতের ফসলগুলো স্থানীয় আবহাওয়া ও মাটির সঙ্গে অধিক খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম, যা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং বহিরাগত রাসায়নিকের উপর নির্ভরতা কমায়।

দেশীয় বীজ থেকে উৎপাদিত ফসলে কেবল রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশই কম থাকে না, বরং সেগুলোর পুষ্টিগুণও তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। BRRI (বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট) এর এক তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশীয় জাতের লাল চাল, যেমন- কালমেঘি বা গামারি, আধুনিক হাইব্রিড জাতের তুলনায় ফাইবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থে (যেমন ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস) সমৃদ্ধ। এই জাতগুলো মাটির গভীর থেকে পুষ্টি আহরণ করতে পারে, যা তাদের পুষ্টি প্রোফাইলকে আরও উন্নত করে। এছাড়া, দেশি জাতের সবজি ও ফলমূলে ফাইটোকেমিক্যালস এবং ভিটামিনের পরিমাণ অনেক সময় হাইব্রিড জাতের চেয়ে বেশি থাকে, যা মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। এই ধরনের চাষাবাদ মাটির উর্বরতা বজায় রাখে এবং কৃষকদের রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের পেছনে ব্যয় কমাতে সাহায্য করে, যা তাদের অর্থনৈতিকভাবেও স্বাবলম্বী করে তোলে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ও অর্গানিক কৃষিকে উৎসাহিত করার জন্য বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা নিয়ে কাজ করছে, যা স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

দেশীয় বীজের ব্যবহার শুধু পুষ্টিগত শ্রেষ্ঠত্বই দেয় না, বরং এটি জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের ঐতিহ্যবাহী শস্যগুলি প্রায়শই স্থানীয় জলবায়ু পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম, যেমন খরা সহনশীলতা বা লবণাক্ততা প্রতিরোধের ক্ষমতা। এই বৈশিষ্ট্যগুলি আধুনিক হাইব্রিড বা জিএম বীজে অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে, কারণ সেগুলি উচ্চ ফলনের জন্য নির্দিষ্ট পরিবেশগত শর্তের উপর নির্ভরশীল। DAE এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা সহনশীল দেশীয় ধানের জাতগুলির চাষাবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পরিবর্তিত জলবায়ুতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করছে। এছাড়া, অর্গানিক ফার্মিং কার্বন নিঃসরণ কমাতেও সহায়ক, কারণ এটি রাসায়নিক সার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি এবং পরিবহন খরচ হ্রাস করে। মাটির জৈব পদার্থ বৃদ্ধি করে এটি কার্বন ধরে রাখতেও ভূমিকা রাখে, যা পরিবেশগত স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।

ফসলের জাত পুষ্টি উপাদান (প্রতি ১০০ গ্রাম) ২০১০ সালে চাষাবাদের হার (%) ২০২২ সালে চাষাবাদের হার (%) পরিবর্তন (%)
দেশি কালোজিরা ধান (BRRI ধান) ফাইবার: ৩.২ গ্রাম, আয়রন: ২.১ মিগ্রা ৫% ১২% +৭%
হাইব্রিড ধান (BRRI ধান) ফাইবার: ১.৫ গ্রাম, আয়রন: ০.৮ মিগ্রা ৫০% ৪০% -১০%
দেশি শিম (BARI শিম) প্রোটিন: ৪.৫ গ্রাম, ভিটামিন সি: ২৫ মিগ্রা ১৫% ২০% +৫%
হাইব্রিড শিম (BARI শিম) প্রোটিন: ২.৮ গ্রাম, ভিটামিন সি: ১৫ মিগ্রা ৩৫% ২৫% -১০%

উৎস: DAE, BRRI ও BARI-এর যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন, ২০২২

সুপারিশ

  • কৃষি মন্ত্রণালয় এবং DAE-কে যৌথভাবে 'দেশি বীজ সংরক্ষণ ও বিতরণ আইন' প্রণয়ন করে দেশীয় বীজের বাণিজ্যিকীকরণ ও কৃষকদের কাছে সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে, এবং প্রতিটি জেলায় BARI-এর তত্ত্বাবধানে দেশীয় বীজ ব্যাংক স্থাপন করতে হবে।
  • পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে 'জৈব কৃষি উন্নয়ন তহবিল' গঠন করে অর্গানিক ফার্মিং অনুশীলনকারী কৃষকদের জন্য BRRI ও BARC এর মাধ্যমে গবেষণা অনুদান, প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ায় আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে হবে, যার মাধ্যমে জৈব পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ হবে।
  • BRRI এবং BARC-কে তাদের গবেষণা কার্যক্রমে দেশীয় ফসলের পুষ্টিগুণ ও জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির উপর গুরুত্বারোপ করে নতুন জাত উদ্ভাবন এবং DAE এর মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে এই উন্নত দেশীয় জাতগুলি জনপ্রিয় করার জন্য নিয়মিত কর্মশালা ও প্রদর্শনীর আয়োজন করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সুমাইয়া পারভীন

সুমাইয়া পারভীন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

کوئی تبصرہ نہیں ملا


News Card Generator