মেগা প্রকল্পে দুর্নীতির মহোৎসব: হাজার হাজার কোটি টাকার নয়ছয় | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মেগা প্রকল্পে দুর্নীতির মহোৎসব: হাজার হাজার কোটি টাকার নয়ছয়

ইমরান খান  avatar   
ইমরান খান
মেগা প্রকল্পে দুর্নীতির মহোৎসব: হাজার হাজার কোটি টাকার নয়ছয়
মেগা প্রকল্পে দুর্নীতির মহোৎসব: হাজার হাজার কোটি টাকার নয়ছয়
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো মেগা প্রকল্পগুলো, যা দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই গুরুত্বপূর্ণ খ...

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো মেগা প্রকল্পগুলো, যা দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি এখন দুর্নীতি, অনিয়ম এবং টেন্ডার সিন্ডিকেটের এক মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য, যা দেশের উন্নয়ন যাত্রাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং জনগণের করের টাকার অপচয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের একটি টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিকল্পনা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ত্রুটি, দুর্নীতি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে আটটি মেগা প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলিত বাজেটের চেয়ে ৬৮ শতাংশ বা ৭.৫২ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রকল্পগুলোর প্রাথমিক ব্যয় ছিল ১১.২ বিলিয়ন ডলার, যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮.৬৪ বিলিয়ন ডলারে। পদ্মা সেতু, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, যমুনা রেল সেতু, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে, বঙ্গবন্ধু টানেল, ঢাকা এমআরটি লাইন ৬, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) লাইন-৩ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো এই ব্যয় বৃদ্ধির শিকার হয়েছে। এদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে আটটি মেগা প্রকল্পে ২১ হাজার কোটি টাকা লোপাট ও আত্মসাতের অভিযোগের তদন্তে নেমেছে এবং সংশ্লিষ্ট নথি তলব করেছে। এর মধ্যে আশ্রয়ণ প্রকল্প, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (BEZA) এবং বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (BEPZA) সম্পর্কিত প্রকল্পও রয়েছে। দুদক পদ্মা সেতু দুর্নীতি ষড়যন্ত্র মামলা এবং বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার দুর্নীতি মামলাও পুনরায় তদন্ত করছে। পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিগত সরকারের আমলে মেগা প্রকল্পের নামে বড় ধরনের দুর্নীতি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র কমিটিও সাতটি মেগা প্রকল্পে অন্তত ৮০ হাজার কোটি টাকা লোপাটের তথ্য উদঘাটন করেছে।

শুধুমাত্র মেগা প্রকল্পই নয়, সড়ক ও সেতু নির্মাণ খাতেও দুর্নীতির চিত্র ভয়াবহ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত সড়ক ও সেতু খাতে সরকারের মোট বরাদ্দের ২৩ থেকে ৪০ শতাংশই দুর্নীতিতে চলে গেছে, যার আর্থিক পরিমাণ ২৯ হাজার ২৩০ কোটি টাকা থেকে ৫০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। এই দুর্নীতি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ১০টি জোনের ১৩টি সার্কেলের ২১টি বিভাগীয় দপ্তরের আওতাধীন প্রকল্পগুলোতে ঘটেছে। টেন্ডার সিন্ডিকেটগুলো এই খাতের দুর্নীতির অন্যতম প্রধান কারণ। সারের সিন্ডিকেট ভাঙার মাধ্যমে সরকার এক টেন্ডারেই ২৩৩ কোটি টাকার বেশি সাশ্রয় করতে পেরেছে, যা সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা বাড়াতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নতুন নিয়ম চালু করলেও সিন্ডিকেটগুলো নতুন কৌশলে তাদের প্রভাব বজায় রাখছে। ঠিকাদাররা পুরাতন সেতু ভেঙে নতুন করে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করছে। সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর সড়কের রাধানগর পয়েন্টে সেতু ও কালভার্ট নির্মাণে ব্যাপক দুর্নীতি ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ১৮ কোটি টাকার বিল উত্তোলন করা হয়েছে। সিলেটের বালাগঞ্জের ফতুরখাড়া সেতু নির্মাণেও ব্যাপক অনিয়ম ও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার অভিযোগ রয়েছে, যেখানে রাতের আঁধারে নিম্নমানের কাজ করা হচ্ছে। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় আট বছর আগে নির্মিত তিনটি সেতুর সংযোগ সড়ক না থাকায় মানুষকে বাঁশের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হচ্ছে, যেখানে ঠিকাদার কাজ শেষ না করেই বিল ও জামানতের টাকা তুলে নিয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এলজিইডির প্রকল্প পরিচালক কাজী মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও জনবল নিয়োগে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী বাচ্চু মিয়ার বিরুদ্ধে হোয়াটসঅ্যাপে গোপন প্রাক্কলিত মূল্য ঠিকাদারদের কাছে পাঠিয়ে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তর গত ১৫ বছর ধরে হাজার হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল, যেখানে কর্মকর্তারা বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন।

এই ব্যাপক দুর্নীতির মূল কারণ হিসেবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবকে দায়ী করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রকল্প বাতিলের আগেই প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা সরকারি অর্থ ব্যয় হয়ে গেছে, যা নীতিগত ও আর্থিক ব্যর্থতার প্রমাণ। শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রীও প্রকল্প বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই পরিস্থিতি দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করছে। দুর্নীতির কারণে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় উভয়ই বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সুপারিশ: এই ভয়াবহ দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। প্রথমত, দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করতে হবে, যাতে তারা কোনো প্রকার রাজনৈতিক চাপ ছাড়াই তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে। দ্বিতীয়ত, সরকারি ক্রয় আইন ও টেন্ডার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে হবে, যাতে সিন্ডিকেটের প্রভাব ভেঙে যায় এবং সত্যিকারের প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হয়। তৃতীয়ত, প্রকল্প অনুমোদনের আগে কঠোর সম্ভাব্যতা যাচাই এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে নিয়মিত ও স্বাধীন নিরীক্ষা (audit) নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, প্রকল্প বাস্তবায়নে জড়িত কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়। পঞ্চমত, জনগণের অংশগ্রহণ এবং গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে তথ্য অনুসন্ধানের সুযোগ দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: ইমরান খান

ইমরান খান, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: মেগা প্রজেক্ট, সড়ক, সেতু ও টেন্ডার সিন্ডিকেট।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator