অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার: নীরব মহামারী ও জনস্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার: নীরব মহামারী ও জনস্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

ডা. আসিফ মাহমুদ  avatar   
ডা. আসিফ মাহমুদ
অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার: নীরব মহামারী ও জনস্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার: নীরব মহামারী ও জনস্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জ...

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব মহামারী ডেকে আনছে। প্রতিবেদনটি উল্লেখ করেছে, গত পাঁচ বছরে দেশের প্রধান প্রধান সরকারি হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের হার প্রায় ৩০% বেড়েছে, বিশেষ করে তৃতীয় প্রজন্মের সেফালোস্পোরিন এবং ফ্লুরোকুইনোলন শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকগুলোর কার্যকারিতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এই তথ্য কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি ভবিষ্যতের এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকটের অশনি সংকেত, যা মোকাবিলায় জরুরি ও সমন্বিত পদক্ষেপ অপরিহার্য।

অ্যান্টিবায়োটিকের অযাচিত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বাংলাদেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ। ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৭০% অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবস্থাপত্র অপ্রয়োজনীয়, ভুল মাত্রায় অথবা ভুল রোগের জন্য লেখা হয়। বিশেষত, সর্দি-কাশি বা ভাইরাল সংক্রমণের মতো সাধারণ অসুস্থতার ক্ষেত্রেও অ্যান্টিবায়োটিকের প্রেসক্রিপশন একটি সাধারণ প্রবণতা। এর পাশাপাশি, ফার্মেসিগুলো থেকে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি হওয়ার প্রবণতাও রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধির অন্যতম অনুঘটক। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (NIMH) এর একটি অপ্রকাশিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, মানসিক চাপ বা অস্থিরতা থেকেও অনেক রোগী অপ্রয়োজনীয়ভাবে চিকিৎসকের কাছে অ্যান্টিবায়োটিকের জন্য চাপ দেন, যা চিকিৎসকদেরও অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে। এই সম্মিলিত প্রপঞ্চ রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়াকে পরিবর্তিত হতে এবং প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করছে, যার ফলে সাধারণ সংক্রমণও মারাত্মক রূপ ধারণ করছে এবং চিকিৎসার খরচ ও সময় উভয়ই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এক গভীর সংকট তৈরি করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মতে, ২০৫০ সাল নাগাদ AMR বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ১ কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে, যা ক্যান্সারের চেয়েও ভয়াবহ হবে। বাংলাদেশে, এই প্রবণতা ইতোমধ্যে বিদ্যমান স্বাস্থ্য অবকাঠামোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। জটিল অস্ত্রোপচার, ক্যান্সার কেমোথেরাপি, অঙ্গ প্রতিস্থাপন এবং নবজাতকের যত্নের মতো অনেক আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতার উপর নির্ভরশীল। যদি প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকগুলি কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তবে এই ধরনের চিকিৎসাগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে এবং রোগীর সুস্থতার সম্ভাবনা কমে যাবে। এমনকি সাধারণ সংক্রমণ, যেমন মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI) বা নিউমোনিয়াও জীবনঘাতী হতে পারে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) যদিও AMR মোকাবিলায় একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে, তবে মাঠ পর্যায়ে এর কার্যকর বাস্তবায়ন এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে গ্রামীণ ও শহরতলী অঞ্চলে যেখানে স্বাস্থ্যসেবার প্রবেশাধিকার সীমিত এবং অ্যান্টিবায়োটিকের সহজলভ্যতা বেশি, সেখানে রেজিস্ট্যান্সের হার আরও দ্রুত বাড়ছে।

এই নীরব মহামারী কেবল মানুষের স্বাস্থ্য নয়, দেশের অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। রেজিস্ট্যান্ট সংক্রমণের চিকিৎসায় দীর্ঘ হাসপাতালে ভর্তি, ব্যয়বহুল নতুন প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার এবং জটিল চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োজন হয়, যা রোগীর পরিবার এবং জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেট উভয়ের উপরই অতিরিক্ত বোঝা চাপায়। ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DGDA) এর সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণ অনুসারে, গত তিন বছরে অ্যান্টিবায়োটিকের বাজারে নতুন ও উচ্চমূল্যের অ্যান্টিবায়োটিকের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা রেজিস্ট্যান্সের ফলে পুরনো অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হারানোর ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া, রেজিস্ট্যান্সের কারণে কর্মক্ষম মানুষের অসুস্থতা ও উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়, যা সামগ্রিকভাবে দেশের জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই জটিল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য একটি বহুমাত্রিক এবং সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি, যেখানে সরকার, স্বাস্থ্য পেশাদার, ঔষধ শিল্প এবং সাধারণ জনগণ সবাইকেই তাদের নিজ নিজ ভূমিকা পালন করতে হবে।

অ্যান্টিবায়োটিকের ধরন ২০১৬ সালে রেজিস্ট্যান্স হার (%) ২০২১ সালে রেজিস্ট্যান্স হার (%) বৃদ্ধির হার (%)
অ্যামোক্সিসিলিন (Amoxicillin) ৩৮% ৫২% ১৪%
সেফট্রিয়াক্সন (Ceftriaxone) ২৭% ৪৩% ১৬%
সিপ্রোফ্লক্সাসিন (Ciprofloxacin) ৪৫% ৬১% ১৬%
অ্যাজিথ্রোমাইসিন (Azithromycin) ৩০% ৪২% ১২%
জেন্টামাইসিন (Gentamicin) ৩৫% ৪৯% ১৪%

উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) ও ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) এর যৌথ সমীক্ষা, ২০২২

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক প্রণীত 'জাতীয় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স কন্টেনমেন্ট স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান' এর বাস্তবায়ন জোরদার করতে হবে এবং এর আওতায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে অ্যান্টিবায়োটিকের অযাচিত ব্যবহার পর্যবেক্ষণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
  • ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DGDA) কে ঔষধ আইন, ২০২২ এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যতীত কোনো ফার্মেসি অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করতে না পারে এবং এই আইনের লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান কার্যকর করতে হবে।
  • ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর অধীনে একটি জাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স মনিটরিং ও রিপোর্টিং সিস্টেম (NAMRS) প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং নিয়মিত প্রকাশ করবে এবং এই ডেটার ভিত্তিতে জাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের গাইডলাইন হালনাগাদ করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. আসিফ মাহমুদ

ডা. আসিফ মাহমুদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জনস্বাস্থ্য ও মহামারী প্রতিরোধ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator