সম্প্রতি, বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর (DAE) কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, গত দুই দশকে সুন্দরবনের ভারতীয় অংশে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২০% এবং বাংলাদেশ অংশে এই বৃদ্ধি গড়ে ১৫%। এই অভূতপূর্ব লবণাক্ততা বৃদ্ধি কেবল নদী ও খালের পানিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং মাটির গভীরেও এর প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা ম্যানগ্রোভ বনভূমির বাস্তুতন্ত্রের জন্য এক ভয়াবহ অশনি সংকেত। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, লবণাক্ততা সহনশীলতার মাত্রার পরিবর্তন ঘটলে সুন্দরী, গেওয়া, পশুর ও কেওড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ প্রজাতির স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বনের কাঠামো ও জীববৈচিত্র্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই পরিস্থিতি সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সুরক্ষা বলয়কে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং এর ফলে রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যশৃঙ্খল হুমকির মুখে পড়েছে।
সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো এর ম্যানগ্রোভ বন, যা লবণাক্ততা সহনশীল উদ্ভিদ দ্বারা গঠিত। তবে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উজানে মিঠাপানির প্রবাহ হ্রাস পাওয়ার কারণে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে লবণাক্ততার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে কৃষিজমি পতিত থাকছে এবং মিষ্টি পানির উৎস সংকুচিত হচ্ছে, যা কেবল মানববসতি নয়, বনের অভ্যন্তরের বন্যপ্রাণীদের জন্যও পানীয় জলের সংকট তৈরি করছে। বিশেষ করে, শুষ্ক মৌসুমে সুন্দরবনের অভ্যন্তরীন নদ-নদীর লবণাক্ততা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, বাঘ ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য পানের উপযোগী জল পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। এর ফলে, বাঘ লোকালয়ে চলে আসার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, যা মানব-বন্যপ্রাণী সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিগত পাঁচ বছরে সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বাঘের আক্রমণে অন্তত ১০ জন গ্রামবাসীর প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, যার অন্যতম কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞদের মতে বাঘের খাদ্য ও মিষ্টি পানির অনুসন্ধানকে দায়ী করা হয়েছে। এই সংকট বনের প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খলকেও প্রভাবিত করছে; লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে মাছ ও কাঁকড়ার প্রজনন ক্ষেত্রগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা বাঘের প্রধান খাদ্য উৎস।
লবণাক্ততার এই আগ্রাসন শুধু ম্যানগ্রোভের প্রজাতিগত পরিবর্তনই আনছে না, বরং বনের সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং এর কার্বন শোষণ ক্ষমতাকেও হ্রাস করছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুন্দরবনের কিছু এলাকায় সুন্দরী গাছের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে কমে যাচ্ছে এবং তার স্থান দখল করছে লবণাক্ততা সহনশীল কিন্তু কম অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব সম্পন্ন গেওয়া বা গরান গাছ। এটি কেবল বনের কাঠ উৎপাদন ক্ষমতাকেই প্রভাবিত করছে না, বরং বনের কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ ক্ষমতাও হ্রাস পাচ্ছে, যা বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ মন্ত্রণালয় (MoEFCC) কর্তৃক পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের মোট কার্বন মজুদ গত এক দশকে প্রায় ৫% কমেছে, যার প্রধান কারণ হিসেবে লবণাক্ততার কারণে ম্যানগ্রোভের মৃত্যু এবং নতুন চারা জন্মানোর হার কমে যাওয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি বনের প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) কর্তৃক সুন্দরবনকে 'বিপন্ন' প্রজাতি হিসেবে ঘোষণা করার সম্ভাবনাও এই লবণাক্ততার কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
| বছর | সুন্দরবনের অভ্যন্তরে গড় লবণাক্ততা বৃদ্ধি (ppt) | সুন্দরী গাছের মৃত্যুহার বৃদ্ধি (%) | বাঘের লোকালয়ে অনুপ্রবেশের ঘটনা (সংখ্যা) |
|---|---|---|---|
| ২০০০-২০০৫ | ০.৫ | ২.৩ | ১২ |
| ২০০৬-২০১০ | ০.৮ | ৪.১ | ১৮ |
| ২০১১-২০১৫ | ১.৩ | ৬.৫ | ২৫ |
| ২০১৬-২০২০ | ১.৮ | ৮.৭ | ৩৪ |
| ২০২১-২০২৩ | ২.২ | ১০.২ | ৪১ |
উৎস: বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর (DAE), খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও বন বিভাগ (২০২৩-এর সমন্বিত প্রতিবেদন)।
সুপারিশ
- পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং DAE-কে যৌথভাবে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে মিঠাপানির উৎস পুনরুজ্জীবিত করতে একটি ব্যাপক প্রকল্প হাতে নিতে হবে। এক্ষেত্রে, 'জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট আইন, ২০১০' এর আওতায় তহবিল ব্যবহার করে শুষ্ক মৌসুমে উজানের নদীগুলোতে (যেমন গঙ্গা) পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ এবং সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ খাল ও জলাধারগুলো নিয়মিত খনন ও সংস্কার করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
- DAE, BARI, BRRI এবং BARC-এর সমন্বিত গবেষণার ভিত্তিতে লবণাক্ততা সহনশীল নতুন ম্যানগ্রোভ প্রজাতির চারা উৎপাদন ও রোপণের একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। 'বন আইন, ১৯২৭' এবং 'বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২' এর অধীনে এই রোপণ কর্মসূচিকে আইনি সুরক্ষা প্রদান করে, বিশেষত সুন্দরী গাছের প্রজাতিগত পুনরুৎপাদন নিশ্চিত করতে জেনেটিক গবেষণার মাধ্যমে উন্নত জাত উদ্ভাবন ও প্রয়োগে জোর দিতে হবে।
- পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং DAE-কে 'বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫' এর অধীনে সুন্দরবনের চারপাশে একটি 'বাফার জোন' ঘোষণা করে শিল্পায়ন ও অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এই জোনে লবণাক্ততা বৃদ্ধির উৎসগুলো চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পরিবেশ-বান্ধব বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করতে 'বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা, ২০০৯' এর আওতায় তহবিল বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।