কুলিয়ারচরের ক্রমবর্ধমান নারী ও শিশু নির্যাতন: বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে… | আই নিউজ বিডি

কুলিয়ারচরের ক্রমবর্ধমান নারী ও শিশু নির্যাতন: বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে ভাঙছে সামাজিক কাঠামো..

Ali Sohel avatar   
Ali Sohel
কুলিয়ারচরের ক্রমবর্ধমান নারী ও শিশু নির্যাতন: বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে ভাঙছে সামাজিক কাঠামো..
কুলিয়ারচরের ক্রমবর্ধমান নারী ও শিশু নির্যাতন: বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে ভাঙছে সামাজিক কাঠামো..
ছবি: সংগৃহীত
****

কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণ মামলার ধীরগতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি জনমনে গভীর শঙ্কা তৈরি করেছে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবেই এই সামাজিক ব্যাধি বর্তমানে মহামারি আকার ধারণ করেছে।

কুলিয়ারচর উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি জননিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছে। গত কয়েক মাসে নারী ও শিশু ধর্ষণের একাধিক ঘটনা স্থানীয়ভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা আইনি লড়াইয়ে দীর্ঘসূত্রতার কবলে পড়ছেন। মূলত অপরাধীদের রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় সমঝোতার চাপ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার জটিলতায় প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং দেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার এক করুণ চিত্র। যখন কোনো অপরাধী দ্রুত বিচারের মুখোমুখি হয় না, তখন অপরাধের মাত্রা ও ধরণ উভয়ই বৃদ্ধি পায়, যা কুলিয়ারচরের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে স্পষ্ট প্রতীয়মান।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, মামলা দায়ের করার পর থেকেই তারা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের পক্ষ থেকে নানা ধরনের হুমকি ও চাপের মুখে পড়েন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দরিদ্র পরিবারগুলো আইনি সহায়তা ও আর্থিক সংকটের কারণে মাঝপথেই বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে দেয়। ভুক্তভোগীদের মতে, থানায় অভিযোগ করার পর তদন্তের ধীরগতি এবং ফরেনসিক প্রতিবেদনের দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের জন্য একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। মাঠ পর্যায়ের এই বাস্তবতায় নারীরা প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কর্মক্ষেত্রে যাতায়াত তাদের জন্য এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরাধের বিচার না পাওয়ার এই সংস্কৃতি ভুক্তভোগীদের মনে যে ট্রমা তৈরি করছে, তা দীর্ঘমেয়াদে তাদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও জনমনে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। অপরাধের পর লোক দেখানো তৎপরতা দেখা গেলেও পরবর্তীতে ঘটনার মোড় ঘুরে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়সারা বক্তব্য দেওয়া হলেও, কঠোর নজরদারি ও অপরাধীদের দ্রুত শনাক্তকরণে তাদের কার্যকর উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। সমাজবিজ্ঞানী ও আইনবিজ্ঞদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে হলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ের সচেতনতা বৃদ্ধি ও কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা জোরদার করার মাধ্যমে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কমানো সম্ভব হতে পারে।

ভবিষ্যতে এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি বজায় থাকলে তা দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেবে। নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা রোধে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং বিচারিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। যদি অপরাধীরা শাস্তির ভয় না পায়, তবে সমাজ ধীরে ধীরে এক ভয়াবহ অরাজকতার দিকে ধাবিত হবে। তাই রাষ্ট্রকে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং ভুক্তভোগীদের জন্য রাষ্ট্রীয় আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, কুলিয়ারচরের মতো জনপদগুলোতে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হতে থাকবে এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হবে।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator