রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনজিও কার্যক্রমে অনিয়ম: ত্রাণ অপচয় ও জবাবদিহিতার সংকট | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনজিও কার্যক্রমে অনিয়ম: ত্রাণ অপচয় ও জবাবদিহিতার সংকট

আরাফাত হোসেন  avatar   
আরাফাত হোসেন
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনজিও কার্যক্রমে অনিয়ম: ত্রাণ অপচয় ও জবাবদিহিতার সংকট
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনজিও কার্যক্রমে অনিয়ম: ত্রাণ অপচয় ও জবাবদিহিতার সংকট
ছবি: সংগৃহীত
মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গার মানবিক সহায়তায় দেশি-বিদেশি এনজিওগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে, এই বিশাল মানবিক কা...

মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গার মানবিক সহায়তায় দেশি-বিদেশি এনজিওগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে, এই বিশাল মানবিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরেই প্রশ্ন উঠছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন ও তদন্তে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এনজিও কার্যক্রমের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি এবং ত্রাণ সহায়তার অপচয়ের চিত্র উঠে এসেছে, যা এই খাতের সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক অনুদান কমে আসার প্রেক্ষাপটে এই অনিয়মগুলো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য আরও বড় সংকট তৈরি করছে।

সর্বশেষ এবং সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য এসেছে জাতিসংঘের একটি অভ্যন্তরীণ অডিট রিপোর্ট থেকে। নিউ এজ পত্রিকায় প্রকাশিত (২ জুলাই, ২০২৬) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতিসংঘের সদর দপ্তরের অফিস অফ ইন্টারনাল ওভারসাইট সার্ভিসেস (OIOS) ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের ইউএনএইচসিআর পরিচালিত রোহিঙ্গা সহায়তা প্রকল্পগুলোর ওপর একটি অডিট পরিচালনা করে। এই অডিটে গুরুতর অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম এবং ত্রাণ সহায়তার অপব্যবহারের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের হাত দিয়ে খাওয়ার অভ্যাস থাকা সত্ত্বেও তাদের জন্য ১ লাখ ৮২ হাজার ডলার মূল্যের চামচ, কাঁটাচামচ ও ছুরি কেনা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অপচয়। এছাড়াও, ১৩ লাখ ২০ হাজার ডলার বা প্রায় ১৬ কোটি ১০ লাখ টাকা মূল্যের ৬২ হাজারের বেশি কুকিং সেট গুদামে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। অডিটে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন ও বৈদ্যুতিক স্থাপনার কাজ একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করানোর মতো স্বার্থের সংঘাতেরও প্রমাণ মিলেছে। টেলিকম টাওয়ার স্থাপনে ৫৬ হাজার ডলার মূল্যের উপকরণ নষ্ট হয়েছে এবং ৩ লাখ ৬৭ হাজার ডলার ব্যয় করেও তা কাজে আসেনি। এই ধরনের অপচয় এমন এক সময়ে ঘটছে যখন রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ সহায়তার পরিমাণ দিনে দিনে কমছে এবং তাদের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে সাহায্য সংস্থাগুলো হিমশিম খাচ্ছে।

জাতিসংঘের মতো সংস্থার কার্যক্রমে এমন অনিয়মের পাশাপাশি স্থানীয় ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর বিরুদ্ধেও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালের মে মাসে ইকো সোশ্যাল ডেভলপমেন্ট অরগানাইজেশন (ESDO) নামক একটি এনজিওর বিরুদ্ধে কর্মীদের বেতন থেকে সংস্থার তহবিলে 'কন্ট্রিবিউশন'-এর নামে কমিশন চাওয়ার অভিযোগ ওঠে। কমিশন দিতে রাজি না হওয়ায় ৮ জন কর্মীকে চাকরিচ্যুত করার ঘটনা ঘটে, যা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। একই বছর (আগস্ট, ২০২৩) কক্সবাজারের ফ্রেন্ডশিপ এনজিওর বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, আর্থিক অনিয়ম এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিরোধী কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। এছাড়াও, ২০২১ সালের জুলাই মাসে বিতর্কিত দাতব্য সংস্থা হিউম্যান কনসার্ন ইন্টারন্যাশনাল (HCI) কানাডায় জঙ্গি অর্থায়ন সন্দেহে বহিষ্কৃত ও বিপুল অর্থ জরিমানা হওয়ার পরও দেশীয় এনজিও 'প্রান্তিক উন্নয়ন সোসাইটি'-র মাধ্যমে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে। এর আগে ২০১৯ সালে রোহিঙ্গাদের উস্কানি প্রদান, কার্যক্রম পরিচালনার শর্ত ভঙ্গসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে বাংলাদেশ সরকার ৪১টি এনজিওর কার্যক্রম ক্যাম্পের অভ্যন্তরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল।

এই অনিয়ম ও অপচয়ের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এনজিওগুলোর গতিবিধির ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালের মে মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এনজিও কার্যক্রমের আড়ালে কোনো অস্থিরতা তৈরি না হয় সেদিকে নজর রাখার ওপর জোর দেন। এনজিওগুলোকে তাদের সকল কর্মীর তালিকা ও সরঞ্জাম কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকের কাছে রিপোর্ট করতে হয় এবং প্রকল্পের লিখিত বিবরণে এনজিও বিষয়ক ব্যুরো কর্মকর্তার অনুস্বাক্ষর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নেতিবাচক কার্যক্রমে জড়িত এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানানো হয়। তবে, আন্তর্জাতিক অনুদান দ্রুত কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ৩০০ মিলিয়ন ডলার দিলেও চলতি বছর তা ৮৫ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা ৭২ শতাংশ হ্রাস। একইভাবে যুক্তরাজ্যের অনুদানও কমেছে প্রায় অর্ধেক। এই ঘাটতি পূরণে বিশ্বব্যাংক ৭০০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প অনুমোদন করলেও, এর মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশকে ঋণ হিসেবে নিতে হচ্ছে, যা দেশের নিজস্ব ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

রোহিঙ্গা সংকট একটি দীর্ঘমেয়াদী মানবিক চ্যালেঞ্জ, যার স্থায়ী সমাধান এখনও অধরা। এমন পরিস্থিতিতে ত্রাণের অর্থ অপচয়, দুর্নীতি এবং অনিয়ম কেবল মানবিক সহায়তার কার্যকারিতাকেই ব্যাহত করে না, বরং এটি দাতা সংস্থা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি করে। বিশেষ করে, যখন আন্তর্জাতিক সহায়তা কমছে, তখন প্রতিটি ডলারের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এনজিওগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং জবাবদিহিতার অভাব সামগ্রিক ত্রাণ কার্যক্রমকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এসব অনিয়ম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে হতাশা বাড়াতে পারে এবং তাদের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করতে পারে, যা বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করে।

সুপারিশ: রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও এনজিও খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অপরিহার্য: ১. সকল দেশি-বিদেশি এনজিওর জন্য নিয়মিত, স্বাধীন ও কঠোর অডিট ব্যবস্থা চালু করা এবং অডিট রিপোর্ট জনসম্মুখে প্রকাশ করা। ২. এনজিও বিষয়ক ব্যুরো এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ৩. প্রকল্প বাস্তবায়ন, কর্মী নিয়োগ এবং পণ্য ক্রয়ে স্বচ্ছতা বাড়াতে ই-টেন্ডারিং এবং কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা। ৪. এনজিও কর্মীদের জন্য একটি স্বাধীন অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা (Whistleblower Protection Mechanism) তৈরি করা, যাতে তারা নির্ভয়ে অনিয়মের তথ্য প্রকাশ করতে পারে। ৫. স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং তাদের মতামত ও চাহিদার ভিত্তিতে প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। ৬. দাতা সংস্থা, জাতিসংঘ এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা, যাতে ত্রাণের অপচয় রোধ হয় এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা সহায়তা পায়।


🔎 অনুসন্ধানে: আরাফাত হোসেন

আরাফাত হোসেন, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও এনজিও (NGO) অডিট।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator