শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ: নিষ্ক্রিয়তার কারণ ও বাজারের ভবিষ্যৎ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ: নিষ্ক্রিয়তার কারণ ও বাজারের ভবিষ্যৎ

তানভীর আহমেদ  avatar   
তানভীর আহমেদ
শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ: নিষ্ক্রিয়তার কারণ ও বাজারের ভবিষ্যৎ
শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ: নিষ্ক্রিয়তার কারণ ও বাজারের ভবিষ্যৎ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) দৈনিক গড় লেনদেন ৫০০ কোটি টাকার নিচে নেমে আসা এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সূচকের ধারাবাহিক নিম্নমুখী প্রবণতা...

সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) দৈনিক গড় লেনদেন ৫০০ কোটি টাকার নিচে নেমে আসা এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সূচকের ধারাবাহিক নিম্নমুখী প্রবণতা দেশের পুঁজিবাজারে এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, গত তিন বছরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের হার ১৯% থেকে কমে ১৪% এর কাছাকাছি চলে আসা বাজারের তারল্য সংকট এবং আস্থার অভাবকে প্রকটভাবে তুলে ধরেছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক বারবার বাজারের গভীরতা বৃদ্ধির আহ্বান সত্ত্বেও, স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের, যেমন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মার্চেন্ট ব্যাংক এবং বীমা কোম্পানিগুলোর নিষ্ক্রিয়তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরণের সংশয় তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি কেবল ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদেরই হতাশ করছে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা এবং অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহের প্রক্রিয়াকেও বাধাগ্রস্ত করছে।

পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিষ্ক্রিয়তার পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ বিদ্যমান। প্রথমত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিএসইসি-এর মধ্যে সমন্বয়হীনতা একটি প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে। ব্যাংকগুলোর শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সীমা (এককভাবে মোট মূলধনের ২৫% এবং সম্মিলিতভাবে ৫০%) এবং এই সীমা গণনার পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা রয়েছে। বিশেষ করে, 'এক্সপোজার লিমিট' গণনার ক্ষেত্রে বাজারমূল্য নাকি ক্রয়মূল্য বিবেচিত হবে, এই বিষয়ে অস্পষ্টতা ব্যাংকিং খাতকে পুঁজিবাজারে পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে। এছাড়া, তারল্য ব্যবস্থাপনার কড়াকড়ি এবং উচ্চ সুদের হার ব্যাংকিং খাতকে সরকারি ট্রেজারি বিল বা বন্ডের মতো ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা শেয়ারবাজারের ঝুঁকি বহনে তাদের অনাগ্রহ তৈরি করছে। একই সাথে, বীমা কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও তাদের প্রিমিয়াম আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা থাকলেও, বাজারের অস্থিরতা এবং নিয়ন্ত্রক তদারকির দুর্বলতার কারণে তারা প্রায়শই এই বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যায় অথবা ন্যূনতম বিনিয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। মার্চেন্ট ব্যাংক এবং পোর্টফোলিও ম্যানেজাররাও নতুন আইপিও বা রাইট শেয়ারের অভাব এবং পর্যাপ্ত তারল্যের অভাবে তাদের বিনিয়োগ কার্যক্রম সংকুচিত করেছে।

দ্বিতীয়ত, বাজারের দুর্বল কর্পোরেট সুশাসন এবং স্বচ্ছতার অভাব প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। অনেক তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে অস্বচ্ছতা, লভ্যাংশ নীতিতে অসংগতি এবং কর্পোরেট কার্যক্রমে জবাবদিহিতার অভাব লক্ষ্য করা যায়। বিএসইসি এসব বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিলেও, অতীতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন কেলেঙ্কারি এবং কারসাজির ঘটনা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মনে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে পর্যাপ্ত সুরক্ষা এবং স্বচ্ছতার অভাবে বিনিয়োগ করতে দ্বিধাগ্রস্ত। এছাড়া, তথ্য-প্রযুক্তির অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) এর মতো সংস্থাগুলোর সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা লেনদেন প্রক্রিয়াকে ধীর এবং জটিল করে তুলছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি নিরুৎসাহী পরিবেশ তৈরি করছে। বাজারের গভীরতা বৃদ্ধির জন্য নতুন ও বৈচিত্র্যময় পণ্যের অভাবও একটি বড় কারণ। ডেরিভেটিভস, শর্ট সেলিং বা ইটিএফ-এর মতো আধুনিক আর্থিক উপকরণের অনুপস্থিতি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি হেজিং এবং পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যকরণের সুযোগ সীমিত করে দিয়েছে।

তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণার অভাব এবং বিনিয়োগ কৌশল প্রণয়নের দুর্বলতাও তাদের নিষ্ক্রিয়তার একটি কারণ। বেশিরভাগ স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর নিজস্ব শক্তিশালী গবেষণা দল নেই, যারা বাজারের মৌলিক বিশ্লেষণ এবং কোম্পানির অন্তর্নিহিত মূল্য নির্ধারণে সক্ষম। এর ফলে তারা প্রায়শই গুজব বা বাজারের প্রবণতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগে আগ্রহী হয়, যা দীর্ঘমেয়াদী টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বাজারের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ডলার সংকট, বিনিয়োগকারীদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করেছে এবং তাদের মধ্যে এক ধরণের সতর্ক মনোভাব তৈরি করেছে। সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির পক্ষ থেকে পুঁজিবাজারের প্রতি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির অভাবও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ। নীতি পরিবর্তন, বিশেষ করে কর নীতি বা লভ্যাংশ নীতির আকস্মিক পরিবর্তন বাজারের পূর্বাভাসযোগ্যতা কমিয়ে দেয়, যা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় ব্যাঘাত ঘটায়। সিএসই এবং ডিএসই-এর মতো স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর আধুনিকায়নে ধীরগতি এবং নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে অনীহা বৈশ্বিক বাজারের সাথে তাল মেলাতে ব্যর্থ হচ্ছে, যা বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

বছর মোট লেনদেনে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ (%) ডিএসই সূচক (ডিএসইএক্স) মোট তালিকাভুক্ত কোম্পানি (ডিএসই)
২০২০ ১৯.২ ৫,৩২৮ ৩৩০
২০২১ ১৮.৫ ৬,৮৫৬ ৩৪০
২০২২ ১৫.৮ ৬,২১৪ ৩৪৬
২০২৩ (জানুয়ারি-অক্টোবর) ১৪.১ ৬,১৪০ ৩৪৯

উৎস: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর মধ্যে একটি স্থায়ী সমন্বয় কমিটি গঠন করতে হবে, যা ব্যাংকের এক্সপোজার লিমিট গণনার পদ্ধতিকে ক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে স্পষ্ট করবে এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (IDRA) এর সাথে সমন্বয় করে বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ করবে।
  • কর্পোরেট সুশাসন নিশ্চিত করতে BSEC-কে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষায় কঠোরতা আরোপ করতে হবে, বিশেষ করে 'ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর' নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং সিডিবিএল-এর প্রযুক্তিগত অবকাঠামো আধুনিকীকরণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে লেনদেন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও নিরাপদ হয়।
  • পুঁজিবাজারে নতুন ও বৈচিত্র্যময় আর্থিক পণ্য, যেমন ডেরিভেটিভস, শর্ট সেলিং এবং এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ETF) চালু করার জন্য BSEC-কে দ্রুত প্রবিধান প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিতে হবে এবং ডিএসই ও সিএসই-কে এই পণ্যগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও প্রশিক্ষণগত সহায়তা প্রদান করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানভীর আহমেদ

তানভীর আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শেয়ারবাজার ও ক্যাপিটাল মার্কেট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nema komentara


News Card Generator