স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: ওষুধ ও সরঞ্জাম কেনাকাটায়… | আই নিউজ বিডি

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: ওষুধ ও সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনিয়মের পাহাড়

রেহনুমা তাবাসসুম  avatar   
রেহনুমা তাবাসসুম
স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: ওষুধ ও সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনিয়মের পাহাড়
স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: ওষুধ ও সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনিয়মের পাহাড়
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত দুর্নীতির এক গভীর জালে আবদ্ধ, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব মহামারীর রূপ নিয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন...

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত দুর্নীতির এক গভীর জালে আবদ্ধ, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব মহামারীর রূপ নিয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর বিভিন্ন অনুসন্ধানে এই খাতের প্রায় প্রতিটি স্তরে দুর্নীতির ব্যাপকতা উঠে এসেছে। বিশেষ করে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনাগুলো বারবার সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের আস্থা ও জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।

কোভিড-১৯ অতিমারীর সময়ে স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা ও দুর্নীতির চিত্র প্রকটভাবে উন্মোচিত হয়। নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই (ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম) কেনাকাটা, হাসপাতালের পর্দা বা বইয়ের মতো সাধারণ সামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্য দেখানো, এমনকি কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কিনে ফেলে রাখার মতো ঘটনাগুলো ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) গত বছর প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সুরক্ষাসামগ্রী সরকারি আইন ও বিধি না মেনেই ক্রয় করে। এই কেনাকাটায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে চুক্তি পর্যন্ত করা হয়নি, পণ্যের মান বা ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার কোনো উদ্যোগ ছিল না, এমনকি সরবরাহকৃত সব সরঞ্জাম ঠিকমতো বুঝে নেওয়া হয়েছিল কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সম্প্রতি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (কুমেক) ওষুধ কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ১০১ টাকা বাজার মূল্যের পেন্টোথাল সোডিয়াম ইনজেকশন ১ হাজার ২৯৯ টাকায় ক্রয় দেখানো হয়েছে। এই ঘটনায় হাসপাতালের পরিচালকসহ একটি সিন্ডিকেট জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে এবং দুদক প্রাথমিক তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে। দুদক এই বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানের জন্য কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আবেদন করবে বলে জানা গেছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে কোভিড-১৯ এর প্রাথমিক পর্যায়ে রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলো অস্বাভাবিক দামে চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনেছে, যার ফলে সরকারের প্রায় ২৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কুয়েত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল প্রতিটি ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকায় দুটি ইসিজি মেশিন কিনেছিল, যার বাজারদর ছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার টাকা।

শুধু কেনাকাটা নয়, স্বাস্থ্য খাতের অন্যান্য ক্ষেত্রেও দুর্নীতির চিত্র উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১১টি খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম চিহ্নিত করেছে দুদক, যার মধ্যে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইকুইপমেন্ট ব্যবহার এবং ওষুধ সরবরাহ অন্যতম। অনেক সময় প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও যন্ত্রপাতি কেনা হয়, যা পরে গুদামে ফেলে রাখা হয় বা অচল অবস্থায় পড়ে থাকে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত স্বীকার করেছেন যে, অপরিকল্পিত কেনাকাটা ও দুর্নীতির কারণে কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা যন্ত্রপাতি অচল অবস্থায় পড়ে আছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরেও দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। টিআইবি-র এক গবেষণা অনুযায়ী, নতুন ওষুধের লাইসেন্স প্রদান থেকে শুরু করে নবায়ন পর্যন্ত ১৩টি খাতে ৫০০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব এবং যোগসাজশের মাধ্যমে এখানে সীমাহীন ঘুষ-বাণিজ্য চলছে। অভিযোগ রয়েছে যে, নকল ওষুধ প্রস্তুতকারী কারখানাগুলোর সাথেও অধিদপ্তরের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

এই দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার মান যেমন নিম্নগামী হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশে চিকিৎসার মোট খরচের প্রায় ৭৪ শতাংশ রোগীকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা প্রতি বছর প্রায় ৬১ লাখ মানুষকে নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিচ্ছে। সম্প্রতি সংসদে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে চিকিৎসা ব্যয়ের ৮০ শতাংশই রোগীর পকেট থেকে আসে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন নিজেও স্বীকার করেছেন যে, 'বিগত অপশাসনের কারণে দেশের স্বাস্থ্য খাত দুর্নীতিতে নিমজ্জিত' এবং সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তবে এই দুর্নীতি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না গেলে, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার না হওয়াও একটি বড় সমস্যা। প্রতি অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়লেও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের হার খুবই কম।

সুপারিশ: স্বাস্থ্য খাতের এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। প্রথমত, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) ২০০৮ কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে এবং ক্রয় প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে আনা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতিতে জড়িত কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অনিয়মের সাহস না পায়। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও তদারকি বাড়াতে হবে এবং দুদকের সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। চতুর্থত, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং নকল ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পঞ্চমত, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দের সঠিক ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা পরিহার করতে হবে। সবশেষে, জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এবং তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে একটি শক্তিশালী জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন গঠন করে স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক সংস্কার সাধন করা জরুরি।

📎 এই প্রতিবেদনের তথ্যপ্রমাণ

গুগল সার্চের মাধ্যমে এই প্রতিবেদনের গবেষণায় ব্যবহৃত প্রকৃত সোর্স:


🔎 অনুসন্ধানে: রেহনুমা তাবাসসুম

রেহনুমা তাবাসসুম, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: স্বাস্থ্য খাত, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটা।

نظری یافت نشد


News Card Generator