ইউরোপের গ্রিন ডিল ও বাংলাদেশের রপ্তানি খাত: নতুন চ্যালেঞ্জের পথনকশা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ইউরোপের গ্রিন ডিল ও বাংলাদেশের রপ্তানি খাত: নতুন চ্যালেঞ্জের পথনকশা

সাদিয়া আফরিন  avatar   
সাদিয়া আফরিন
ইউরোপের গ্রিন ডিল ও বাংলাদেশের রপ্তানি খাত: নতুন চ্যালেঞ্জের পথনকশা
ইউরোপের গ্রিন ডিল ও বাংলাদেশের রপ্তানি খাত: নতুন চ্যালেঞ্জের পথনকশা
ছবি: সংগৃহীত
২০২৩ সালের নভেম্বরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) কর্তৃক কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (CBAM) এর প্রথম ধাপে রিপোর্টিং বাধ্যবাধকতা কার্যকর হওয়ার পর থেকে বা...

২০২৩ সালের নভেম্বরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) কর্তৃক কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (CBAM) এর প্রথম ধাপে রিপোর্টিং বাধ্যবাধকতা কার্যকর হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইইউভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে, ইইউর গ্রিন ডিল, যার লক্ষ্য ২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপকে প্রথম জলবায়ু-নিরপেক্ষ মহাদেশে পরিণত করা, বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতিতে এক আমূল পরিবর্তন আনছে। এই ডিলের অধীনে, ইইউতে প্রবেশকারী পণ্যের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত কার্বনের পরিমাণ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। বাংলাদেশের জন্য, যা ইইউর অন্যতম প্রধান রপ্তানি অংশীদার, এই নতুন নীতিমালার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়া এখন কেবল একটি বাণিজ্যিক কৌশল নয়, বরং একটি অপরিহার্য কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। সম্প্রতি, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রভাব মোকাবেলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য উন্নত বিশ্বের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে, যা ইইউর এই নীতির প্রেক্ষাপটে আরও প্রাসঙ্গিকতা লাভ করে।

ইইউর গ্রিন ডিল কেবল কার্বন নির্গমন কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সার্কুলার ইকোনমি, টেকসই উৎপাদন এবং পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণেও জোর দেয়। বাংলাদেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়া ও হিমায়িত খাদ্য, যা মোট রপ্তানির একটি বড় অংশ জুড়ে, সরাসরি এই নীতিমালার আওতায় পড়বে। উদাহরণস্বরূপ, তৈরি পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল উৎপাদন থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কার্বন পদচিহ্ন কমানোর চাপ বাড়ছে। ইইউর এই নীতি বাংলাদেশের জন্য দ্বৈত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে: একদিকে, উৎপাদন প্রক্রিয়াকে আরও পরিবেশবান্ধব করতে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা, এবং অন্যদিকে, এই পরিবর্তনগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ইইউর সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বাণিজ্য অগ্রাধিকার এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়গুলো বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। এছাড়া, বিমসটেক (BIMSTEC) এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলোর মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির আদান-প্রদান এবং যৌথ গবেষণা ও উন্নয়নের সুযোগ অন্বেষণ করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ইইউর কঠোর মানদণ্ড পূরণে সহায়ক হতে পারে।

ইইউর গ্রিন ডিল কেবল বাণিজ্যিক সম্পর্ক নয়, বরং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথকেও প্রভাবিত করছে। UN Peacekeeping মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সফল অংশগ্রহণ এবং বৈশ্বিক শান্তি রক্ষায় তার ভূমিকা, ইইউ সহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে। এই ইতিবাচক ভাবমূর্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশ ইইউর গ্রিন ডিলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ আকর্ষণে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করতে পারে। গ্রিন ডিলের আওতায়, ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলো নিজেদের কার্বন নির্গমন কমানোর পাশাপাশি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সবুজ বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি সুযোগ, যেখানে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়া গ্রহণের মাধ্যমে ইইউর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা সম্ভব। তবে, সার্ক (SAARC) অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পরিবেশগত মানদণ্ড এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার ভিন্নতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং অভিন্ন কৌশল প্রণয়ন ইইউর গ্রিন ডিলের প্রতিকূল প্রভাব মোকাবেলায় সহায়ক হতে পারে, যা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান কূটনৈতিক এজেন্ডা হওয়া উচিত।

খাত ২০২০ সালে ইইউতে রপ্তানির পরিমাণ (বিলিয়ন ইউএস ডলার) ২০২২ সালে ইইউতে রপ্তানির পরিমাণ (বিলিয়ন ইউএস ডলার) কার্বন নির্গমন হ্রাস লক্ষ্যমাত্রা (২০৩০ সালের মধ্যে, % )
তৈরি পোশাক ১৯.৫ ২৩.৭ ২৫-৩০
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ০.৮ ১.১ ২০-২৫
হিমায়িত খাদ্য ০.৫ ০.৬ ১৫-২০
কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য ০.৪ ০.৭ ১০-১৫

উৎস: বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এবং ইউরোপীয় কমিশন, ২০২৩

সুপারিশ

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ইইউর সঙ্গে একটি উচ্চ-পর্যায়ের 'গ্রিন ডিল ফ্যাসিলিটেশন ডায়ালগ' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতগুলোর জন্য ইইউর 'জাস্ট ট্রানজিশন মেকানিজম' থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও আর্থিক অনুদান প্রাপ্তির পথ সুগম করা হবে।
  • BIMSTEC প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে 'টেকসই উৎপাদন ও সাপ্লাই চেইন স্ট্যান্ডার্ডস' বিষয়ক একটি অভিন্ন নীতি কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে, যা ইইউর নতুন পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে আঞ্চলিক সক্ষমতা বাড়াবে এবং যৌথভাবে কার্বন ফুটপ্রিন্ট হ্রাসের কৌশল নির্ধারণ করবে।
  • UN Peacekeeping মিশনে বাংলাদেশের সফলতার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে 'জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP)' এর সঙ্গে অংশীদারিত্বে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোর জন্য 'কার্বন ফুটপ্রিন্ট মনিটরিং ও রিপোর্টিং' বিষয়ক একটি জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি কর্মসূচি চালু করতে হবে, যা CBAM সম্মতি নিশ্চিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাদিয়া আফরিন

সাদিয়া আফরিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বৈশ্বিক নীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator