পর্যটন ও প্রত্নসম্পদ: অনিয়ম-দুর্নীতির জালে বন্দি বাংলাদেশের ঐতিহ্য | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

পর্যটন ও প্রত্নসম্পদ: অনিয়ম-দুর্নীতির জালে বন্দি বাংলাদেশের ঐতিহ্য

তৌসিফ রহমান  avatar   
তৌসিফ রহমান
পর্যটন ও প্রত্নসম্পদ: অনিয়ম-দুর্নীতির জালে বন্দি বাংলাদেশের ঐতিহ্য
পর্যটন ও প্রত্নসম্পদ: অনিয়ম-দুর্নীতির জালে বন্দি বাংলাদেশের ঐতিহ্য
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার অমিত সম্ভাবনা ধারণ করে। পাহাড়, নদী, সাগর, ব...

বাংলাদেশের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার অমিত সম্ভাবনা ধারণ করে। পাহাড়, নদী, সাগর, বনভূমি এবং হাজার বছরের প্রাচীন নিদর্শনগুলো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সাংস্কৃতিক পরিচিতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে, সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই সম্ভাবনাময় খাতটি দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং উদাসীনতার এক জটিল জালে আটকা পড়েছে, যা দেশের ঐতিহ্য ও পর্যটন শিল্পের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। স্থানীয় সিন্ডিকেট থেকে শুরু করে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরেও চলছে নানা ধরনের অনিয়ম, যা পর্যটকদের হয়রানি করছে এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

পর্যটন খাতে অনিয়মের চিত্র উদ্বেগজনক। দেশের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র যেমন কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সেন্টমার্টিন, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এবং সিলেটে পর্যটকদের হয়রানি, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং স্থানীয় সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য একটি সাধারণ ঘটনা। সিলেটের রাতারগুলে নৌকা ভাড়া বা সিএনজি চালকদের সিন্ডিকেট পর্যটকদের জিম্মি করে রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের (বিপিসি) হোটেল-মোটেলগুলো আকর্ষণীয় স্থানে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও ক্রমাগত লোকসান গুনছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও আমলানির্ভরতাকে দায়ী করা হয়েছে। বেশিরভাগ ইউনিটই তাদের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, কক্সবাজারের হোটেল শৈবাল এবং সিলেটের পর্যটন মোটেলগুলোতে কক্ষ খালি পড়ে থাকে এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জৌলুশ হারিয়েছে। এমনকি দিনাজপুরের পর্যটন মোটেলের ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, কর্মচারী হয়রানি এবং অনৈতিক কার্যকলাপের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে কার্ড এন্ট্রি ছাড়াই অতিথি রাখা এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মতো ঘটনা ঘটছে। বিমান টিকিট সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যও থামছে না। যাত্রীর নাম ও পাসপোর্ট নম্বর ছাড়া বুকিং না করা বা ট্রাভেল এজেন্সির নাম ও মূল মূল্য টিকিটে উল্লেখ করার সরকারি নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। এ বিষয়ে গঠিত টাস্কফোর্সও বর্তমানে নিষ্ক্রিয়।

প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ সংরক্ষণেও একই ধরনের অবহেলা ও দুর্নীতির চিত্র বিদ্যমান। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রত্নসম্পদ চুরি ও পাচারের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বল নজরদারি এবং উদাসীনতার কারণে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নওগাঁর সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো প্রত্নবস্তু পাচারের প্রধান রুট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর জনবল সংকটে ভুগছে, যার ফলে গেজেটভুক্ত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। পানাম নগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোও অবহেলার শিকার হয়ে দখলদারদের কবলে চলে যাচ্ছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালকদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে আঞ্চলিক পরিচালক ড. নাহিদ সুলতানার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং অদক্ষ শ্রমিক দিয়ে কাজ করিয়ে অর্থ নয়ছয়ের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, নদী ভাঙন বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। গত পাঁচ বছরে পদ্মা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে অন্তত ২২টি চিহ্নিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ও স্থাপনা বিলীন হয়ে গেছে, যার মধ্যে সিরাজগঞ্জের কায়েমি জমিদার বাড়ি এবং পাবনার প্রাচীন মসজিদ অন্যতম। মহাস্থানগড়ের মতো ঐতিহাসিক স্থানেও অবৈধ দখল ও নির্মাণকাজের চেষ্টা হয়েছে, যা উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত করা হয়েছে। সরকারি জমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের ঘটনা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর জন্যও হুমকি সৃষ্টি করছে।

এই অনিয়ম ও দুর্নীতির মূল কারণ হিসেবে আইনের দুর্বল প্রয়োগ, জবাবদিহিতার অভাব এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে চিহ্নিত করা যায়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯৬৮ সালের পুরাকীর্তি আইন (সংশোধিত ১৯৭৬) অনুযায়ী কাজ করলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে আইনটির আধুনিকায়ন জরুরি। সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব এবং সরকারি উচ্চ পর্যায়ে প্রত্নসম্পদ সম্পর্কে জ্ঞানের স্বল্পতাও এই খাতের উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রকৌশল বিভাগে পদোন্নতি নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় সম্প্রতি সব ধরনের পদোন্নতি স্থগিত করা হয়েছে, যা মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরেও সুশাসনের ঘাটতি নির্দেশ করে। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীও উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি ও ধীরগতির বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যা সামগ্রিকভাবে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার অভাবের ইঙ্গিত দেয়। এই পরিস্থিতি দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে, যা দেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সুপারিশ: বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ রক্ষায় একটি সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। প্রথমত, পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে স্থানীয় সিন্ডিকেট ও হয়রানি বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং পর্যটন পুলিশকে আরও সক্রিয় ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের লোকসানের কারণ অনুসন্ধান করে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিক ও লাভজনক করতে বেসরকারি অংশীদারিত্বের সুযোগ বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের জনবল সংকট নিরসন, আধুনিক প্রযুক্তি যেমন সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির মাধ্যমে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, প্রত্নসম্পদ পাচার রোধে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো এবং পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পঞ্চমত, নদী ভাঙন থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ এবং এর বাস্তবায়নে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হবে। পরিশেষে, পুরাকীর্তি আইন যুগোপযোগী করা এবং সরকারি জমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে দেশের ঐতিহ্য রক্ষায় সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা নিশ্চিত করতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: তৌসিফ রহমান

তৌসিফ রহমান, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ।

Geen reacties gevonden


News Card Generator