জাহাজ ভাঙা শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পরিবেশ সুরক্ষায় বৈশ্বিক মানদণ্ড ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জাহাজ ভাঙা শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পরিবেশ সুরক্ষায় বৈশ্বিক মানদণ্ড ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

জাহাঙ্গীর আলম  avatar   
জাহাঙ্গীর আলম
জাহাজ ভাঙা শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পরিবেশ সুরক্ষায় বৈশ্বিক মানদণ্ড ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
জাহাজ ভাঙা শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পরিবেশ সুরক্ষায় বৈশ্বিক মানদণ্ড ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে অবস্থিত জাহাজ ভাঙা শিল্পাঞ্চলে গত পাঁচ বছরে অন্তত ৪০ জন শ্রমিকের প্রাণহানি এবং অসংখ্য পরিবেশ দূষণের ঘটনা ঘটেছে। শিল্প মন্ত্রণালয...

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে অবস্থিত জাহাজ ভাঙা শিল্পাঞ্চলে গত পাঁচ বছরে অন্তত ৪০ জন শ্রমিকের প্রাণহানি এবং অসংখ্য পরিবেশ দূষণের ঘটনা ঘটেছে। শিল্প মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মান বৈশ্বিক মানদণ্ডের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে, যা একদিকে যেমন শ্রমিকদের জীবনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে উপকূলীয় প্রতিবেশ ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদী বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিশেষত, পুরাতন জাহাজ থেকে নির্গত অ্যাসবেস্টস, পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইলস (PCBs), ভারী ধাতু এবং তেল জাতীয় বর্জ্য সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য ও সংলগ্ন কৃষি জমির উর্বরতা নষ্ট করছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প বৈশ্বিক মোট জাহাজ ভাঙার প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি সম্পন্ন করে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। তবে, এই প্রবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে পরিবেশগত ও শ্রমিকের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির এক বিশাল চিত্র। ২০০৯ সালে হংকং কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিসাইক্লিং অফ শিপস (The Hong Kong International Convention for the Safe and Environmentally Sound Recycling of Ships, HKC) গৃহীত হলেও, বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘ কালক্ষেপণের পর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে এটি অনুসমর্থন করে, যা কার্যকর হতে আরও অন্তত ২৪ মাস সময় লাগবে। এই দীর্ঘসূত্রতা এবং কার্যকর প্রয়োগের অভাব শিল্পটিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে দূরে রেখেছে। World Bank এর এক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙা শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ এখনও অপ্রতুল। এর ফলে, জাহাজ থেকে উৎপন্ন বিপজ্জনক বর্জ্য, যেমন - স্লাজ, তেল মিশ্রিত পানি, পলিভিনাইল ক্লোরাইড (PVC) এবং অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান সরাসরি পরিবেশে ফেলা হচ্ছে। এই বর্জ্যগুলো বঙ্গোপসাগরের ইকোসিস্টেমের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে এবং স্থানীয় মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এই শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ADB (Asian Development Bank) একাধিকবার বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং শ্রমিক সুরক্ষার মান উন্নয়নের জন্য কারিগরি সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে, কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন ধীর গতিতে চলছে। উদাহরণস্বরূপ, সবুজ জাহাজ ভাঙা (Green Shipbreaking) পদ্ধতির প্রবর্তন, যেখানে বিপজ্জনক বর্জ্য পৃথকীকরণ, পরিশোধন এবং নিরাপদ নিষ্কাশন নিশ্চিত করা হয়, তা এখনও বাংলাদেশের বেশিরভাগ ইয়ার্ডে অনুপস্থিত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) এবং জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) এর মতো সংস্থাগুলোও বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পকে HKC এর অধীনে আনতে এবং এর পরিপালন নিশ্চিত করতে চাপ সৃষ্টি করে আসছে। কিন্তু, স্থানীয় মালিকদের অনীহা এবং দুর্বল নজরদারি ব্যবস্থার কারণে এই আন্তর্জাতিক চাপ খুব বেশি ফলপ্রসূ হচ্ছে না। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক জাহাজ ভাঙা ও জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ বিধিমালা, ২০২২ প্রণয়ন করা হলেও, এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত জনবল এবং আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্টের অভাব এই শিল্পের পরিবেশগত মান উন্নয়নের পথে প্রধান বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

বর্জ্যের প্রকার উৎপাদিত পরিমাণ (টন/জাহাজ) সঠিকভাবে নিষ্পাদিত (%) পরিবেশে নির্গত (%)
অ্যাসবেস্টস ৫-১০ ১০ ৯০
তেল/স্লাজ ৫০-১০০ ২০ ৮০
ভারী ধাতু (সীসা, ক্যাডমিয়াম) ১-৫ ১৫ ৮৫
পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইলস (PCBs) ০.৫-২ ৫ ৯৫
অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক ১০-২০ ১৫ ৮৫

উৎস: পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ; World Bank (২০২৩ সালের ডেটাভিত্তিক অনুমান)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার অবিলম্বে 'জাহাজ ভাঙা ও জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ বিধিমালা, ২০২২' এর কঠোর ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করবে, যেখানে শিল্প মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এই টাস্কফোর্সকে HKC এর মানদণ্ড অনুসরণ করে বর্জ্য পৃথকীকরণ, প্রক্রিয়াকরণ ও নিরাপদ নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে এবং নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে এর অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে হবে।
  • World Bank এবং ADB এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় জাহাজ ভাঙা শিল্পাঞ্চলে একটি সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র (Integrated Waste Management Facility) স্থাপন করা হবে, যেখানে অ্যাসবেস্টস, তেল, স্লাজ এবং অন্যান্য বিপজ্জনক রাসায়নিক বর্জ্য বৈজ্ঞানিকভাবে প্রক্রিয়াকরণ ও নিষ্কাশন করা সম্ভব হবে। এটি বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭ এর আওতায় অনুমোদনপ্রাপ্ত হবে।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে শ্রম মন্ত্রণালয়, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এর সহযোগিতায় জাহাজ ভাঙা শিল্পের শ্রমিকদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করবে, যেখানে বিপজ্জনক বর্জ্য হ্যান্ডলিং, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) ব্যবহার এবং আপৎকালীন পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান প্রদান করা হবে। এই প্রশিক্ষণ 'বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬' এর ধারা ৬৬ ও ৬৭ এবং এর সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী বাধ্যতামূলক করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহাঙ্গীর আলম

জাহাঙ্গীর আলম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator