গত সপ্তাহে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি মে মাসে ইস্পাত উৎপাদন প্রায় ৩০% হ্রাস করেছে, যা দেশের নির্মাণ খাতের স্থিতিশীলতাকে গুরুতর প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে, চট্টগ্রামের বৃহৎ ইস্পাত কারখানাগুলো, যারা দেশের মোট ইস্পাত উৎপাদনের প্রায় ৬০% যোগান দেয়, তারা দৈনিক চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৪০-৫০% গ্যাস সরবরাহ পাচ্ছে। এই সংকটের ফলে রড, কয়েল ও অন্যান্য ইস্পাত পণ্যের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত নির্মাণ ব্যয়কে স্ফীত করে তুলবে এবং জাতীয় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর সময়সীমা ও বাজেটকে প্রভাবিত করবে।
এই গ্যাস সংকট কেবল ইস্পাত খাতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, এটি দেশের সামগ্রিক শিল্পায়ন প্রক্রিয়ার ওপর একটি কাঠামোগত চাপ সৃষ্টি করছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চয়তা উৎপাদন ব্যয়কে গড়ে ১৫-২০% পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে খর্ব করছে। ইস্পাত শিল্পে, যেখানে প্রাকৃতিক গ্যাস চুল্লি পরিচালনা এবং বর্জ্য লোহা গলানোর প্রধান উৎস, সেখানে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে উৎপাদন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়। অনেক কারখানা বাধ্য হচ্ছে তাদের উৎপাদন লাইনের একটি অংশ বন্ধ রাখতে অথবা উচ্চমূল্যের বিকল্প জ্বালানি, যেমন ফার্নেস তেল, ব্যবহার করতে, যা পণ্যের চূড়ান্ত মূল্যকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, শিল্প খাতে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ২,৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও, বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ১,৬০০-১,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই ঘাটতি পূরণে দীর্ঘমেয়াদী কোনো কার্যকর কৌশল এখনও পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে এবং নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের 'বাংলাদেশ ইকোনমিক আউটলুক ২০২৩' প্রতিবেদনে সতর্ক করেছে যে, জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হলে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ০.৫ থেকে ০.৮ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। ইস্পাত শিল্প, যা দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের মেরুদণ্ড, তার উৎপাদন ব্যাহত হলে সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং আবাসন প্রকল্পের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ শ্লথ হয়ে পড়বে। ইতোমধ্যেই, দেশের প্রধান প্রধান নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো ইস্পাত পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সময়মতো সরবরাহ না পাওয়ায় তাদের প্রকল্পের সময়সীমা পুনর্নির্ধারণের আবেদন জানিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প বা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বৃহৎ প্রকল্পগুলোতে ইস্পাত একটি অপরিহার্য উপাদান। এই প্রকল্পগুলো সময়মতো শেষ করতে না পারলে প্রকল্পের ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে, যা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইস্পাত শিল্পের গ্যাস চাহিদা পূরণে অগ্রাধিকার দেওয়া না হলে, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হবে।
| সাল | ইস্পাত শিল্পের মোট গ্যাস চাহিদা (মিলিয়ন ঘনফুট/দিন) | গ্যাস সরবরাহ (মিলিয়ন ঘনফুট/দিন) | ঘাটতি (%) | বার্ষিক উৎপাদন হ্রাস (টন) |
|---|---|---|---|---|
| ২০২০ | ৩৫০ | ৩০০ | ১৪.৩% | ১,৫০,০০০ |
| ২০২১ | ৪০০ | ৩২০ | ২০.০% | ২,৫০,০০০ |
| ২০২২ | ৪৫০ | ৩০০ | ৩৩.৩% | ৪,০০,০০০ |
| ২০২৩ (প্রাক্কলিত) | ৫০০ | ৩২০ | ৩৬.০% | ৬,০০,০০০ |
উৎস: বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) এবং পেট্রোবাংলা প্রতিবেদন।
সুপারিশ
- বাংলাদেশ সরকার ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় কর্তৃক দ্রুত একটি "জাতীয় জ্বালানি অগ্রাধিকার নীতি" প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হোক, যেখানে ইস্পাত ও সিমেন্টের মতো কৌশলগত ভারী শিল্পগুলোর জন্য গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করা হবে এবং বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বাড়াতে Petrobangla-কে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।
- World Bank এবং ADB-এর সহায়তায় এলএনজি আমদানি টার্মিনালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিভিত্তিক এলএনজি আমদানির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'এলএনজি সরবরাহ নিরাপত্তা পরিকল্পনা' তৈরি করা হোক, যাতে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা থেকে দেশের শিল্প খাত সুরক্ষিত থাকে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে ইস্পাত শিল্পে বিকল্প জ্বালানি (যেমন, ইন্ডাকশন ফার্নেস বা বিদ্যুৎ-চালিত চুল্লি) ব্যবহারের জন্য কর অবকাশ বা ভর্তুকি প্রদানের একটি নীতি প্রণয়ন করুক, যাতে কারখানাগুলো গ্যাসনির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত হতে উৎসাহিত হয়।