গত অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে দেশব্যাপী আকস্মিক বিদ্যুৎ বিভ্রাট, যা প্রায় ৮ ঘণ্টা ধরে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহসহ দেশের বড় একটি অংশকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করে রেখেছিল, তা বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের দুর্বলতা এবং জ্বালানি সরবরাহে গভীর সংকটকে আবারও নগ্ন করে তুলেছে। বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি) তাৎক্ষণিকভাবে এই বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি জেনারেটরের ত্রুটিকে দায়ী করলেও, বিদ্যুৎ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত কাঠামোগত দুর্বলতা এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) নির্ভরতার ফাঁদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই ঘটনা কেবল একটি যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল না, বরং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ভঙ্গুরতার একটি বিধ্বংসী প্রতিচ্ছবি, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জনজীবনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কাগজে-কলমে প্রায় ২৬,০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও, উৎপাদন ও বিতরণের মধ্যে এই বিশাল ফারাক এলএনজি আমদানি নির্ভরতার বিষময় ফল। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্যস্ফীতি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা, বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর, বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। পেট্রোবাংলা, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীনস্থ একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে, স্পট মার্কেট থেকে উচ্চ মূল্যে এলএনজি আমদানি করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, যার ফলস্বরূপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। সরকার দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির মাধ্যমে কিছু এলএনজি আমদানি করলেও, ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে প্রায়শই স্পট মার্কেটের দ্বারস্থ হতে হয়, যেখানে দামের ওঠানামা অত্যন্ত তীব্র। এই উচ্চমূল্যের এলএনজি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায়, অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোপুরি চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না, যার ফলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও লোডশেডিং অব্যহত থাকছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এর তথ্যমতে, গ্যাসের অভাবে প্রায় ৩,০০০-৪,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায়শই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতির ওপর এক বিশাল বোঝা।
এলএনজি নির্ভরতা যখন বিদ্যুৎ উৎপাদনকে ব্যাহত করছে, ঠিক তখন জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের দুর্বলতা এই সংকটকে আরও গভীর করছে। দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণের অভাবে প্রায়শই ছোটখাটো ত্রুটিও বড় ধরনের বিভ্রাটে রূপ নিচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার ও বিদ্যুৎ বিভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিলেও, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোতে সমান্তরাল বিনিয়োগের অভাব স্পষ্ট। পুরানো তার, দুর্বল সাবস্টেশন এবং স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তির অনুপস্থিতি বিদ্যুতের অপচয় (সিস্টেম লস) বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং গ্রিডের স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। World Bank এবং ADB এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বহুবার বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে এবং ঋণ সহায়তাও প্রদান করেছে, কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং সমন্বয়হীনতা কাঙ্ক্ষিত ফল আনছে না। উদাহরণস্বরূপ, পিজিসিবি এর অধীনে বেশ কিছু গ্রিড আধুনিকীকরণ প্রকল্প চলমান থাকলেও, সেগুলো নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন না হওয়ায় এবং প্রযুক্তির আপগ্রেডেশন ধীর হওয়ায়, বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই দুর্বল গ্রিড কেবল লোডশেডিং বাড়াচ্ছে না, বরং শিল্প উৎপাদন ব্যাহত করছে এবং দৈনন্দিন জনজীবনে ব্যাপক ভোগান্তি সৃষ্টি করছে।
| সূচক | ২০১৬ | ২০২০ | ২০২২ | ২০২৩ (প্রাক্কলিত) |
|---|---|---|---|---|
| মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা (মেগাওয়াট) | ১২,০০০ | ২০,৮০০ | ২৫,২০০ | ২৬,০০০+ |
| এলএনজি আমদানি (মিলিয়ন মেট্রিক টন) | ০ | ৪.৫ | ৪.০ | ৫.৫ |
| বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের হিস্যা (%) | ৬২% | ৫২% | ৪৮% | ৪৫% |
| জাতীয় গ্রিড সিস্টেম লস (%) | ১১.৫% | ১০.৮% | ৯.৮% | ৯.৫% |
| স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি ক্রয়ে ব্যয় (বিলিয়ন ডলার) | ০ | ০.৮ | ২.৫ | ৩.০ |
উৎস: বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), পেট্রোবাংলা, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, World Bank, ADB।
সুপারিশ
- জ্বালানি বৈচিত্র্যকরণ ও দেশীয় উৎস অনুসন্ধান: বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে দ্রুততার সাথে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রমে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি (সৌর, বায়ু) প্রকল্পে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা)-কে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তহবিল সরবরাহ করতে হবে, যাতে এলএনজি নির্ভরতা কমে আসে।
- গ্রিড আধুনিকীকরণ ও স্মার্ট গ্রিড বাস্তবায়ন: পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-কে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি বাস্তবায়নে একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ভিত্তিক রোডম্যাপ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে এবং সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের আধুনিকায়নে World Bank ও ADB এর সহায়তায় দ্রুত প্রকল্প সম্পন্ন করতে হবে, যাতে সিস্টেম লস কমে ও গ্রিডের স্থিতিশীলতা বাড়ে।
- জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালীকরণ: বাংলাদেশ সরকার ও পেট্রোবাংলাকে দীর্ঘমেয়াদী এবং বহুমুখী চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার প্রভাব কমানো যায় এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়; একই সাথে, জ্বালানি নীতিতে কৌশলগত মজুতের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।