রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্থিরতা: অপরাধ, পাচার ও ত্রাণ কার্যক্রমে প্রশ্ন.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্থিরতা: অপরাধ, পাচার ও ত্রাণ কার্যক্রমে প্রশ্ন..

আরাফাত হোসেন  avatar   
আরাফাত হোসেন
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্থিরতা: অপরাধ, পাচার ও ত্রাণ কার্যক্রমে প্রশ্ন..
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্থিরতা: অপরাধ, পাচার ও ত্রাণ কার্যক্রমে প্রশ্ন..
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলো বর্তমানে এক গভীর সংকটের মুখে। একদিকে যেমন ক্যাম্পগুলোতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আশঙ্কাজনক .....

বাংলাদেশের কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলো বর্তমানে এক গভীর সংকটের মুখে। একদিকে যেমন ক্যাম্পগুলোতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে নিয়োজিত এনজিওগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে তহবিল সংকট, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর নেতিবাচক প্রভাব এবং মানব পাচারের মতো গুরুতর সমস্যাগুলো এই জটিল পরিস্থিতিকে আরও দুর্বোধ্য করে তুলেছে। আই নিউজ বিডি-র অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই খাতের সাম্প্রতিক চিত্র, যা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পথকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলছে।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে হত্যা, অপহরণ, মাদক পাচার, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদক ও অস্ত্রের ব্যবসা, চোরাচালান, মানব পাচার, অপহরণ ও চাঁদাবাজিতে একাধিক সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠী জড়িত। গত আট বছরে প্রায় ৩০০ খুনের ঘটনা ঘটেছে এবং মাদকের আখড়ার সংখ্যা শতাধিক বেড়েছে বলে জানা গেছে। আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা), রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও), আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ) সহ বিভিন্ন সশস্ত্র দল এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মূল হোতা। বিশেষত, আরসা প্রত্যাবাসনবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। এই অপরাধমূলক তৎপরতা স্থানীয়দের জীবনযাত্রার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে, তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং আয়ের পথ সংকুচিত হচ্ছে। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে, যেখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যৌথভাবে কাজ করছে। ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পুলিশ, বিজিবি, এপিবিএন ও আনসার নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে নিয়োজিত এনজিওগুলোও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর অর্থায়ন কমে যাওয়ায় অনেক মানবিক সহায়তা প্রকল্প সংকুচিত হয়ে পড়েছে, যার ফলে স্থানীয় নারীরা, যারা এসব প্রকল্পে কাজ করতেন, তারা চাকরি হারিয়েছেন এবং ভয়াবহ সংকটে পড়েছেন। তহবিল সংকটের কারণে প্রকল্প বন্ধ বা সীমিত হওয়ায় তাদের কর্মজীবন থমকে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি প্রকল্পের আর্থিক তহবিল ১০-১২ কোটি টাকা থেকে কমে ৩-৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি, এনজিওগুলোর কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগও নতুন নয়। ২০১৯ সালে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ৪১টি এনজিওকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অভ্যন্তরে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এসব এনজিওর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের উস্কানি দেওয়া, কার্যক্রম পরিচালনার নির্ধারিত শর্ত ভঙ্গ করা এবং রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। এছাড়াও, ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অরগানাইজেশন (ইএসডিও) নামে একটি এনজিওর বিরুদ্ধে কর্মীদের বেতন থেকে কমিশন চাওয়ার এবং তা না দেওয়ায় আট কর্মীকে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ উঠেছে। এনজিও বিষয়ক ব্যুরো এই খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কাজ করে এবং তাদের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা মানব পাচারের মতো গুরুতর অপরাধে তাদের ঠেলে দিচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি রোহিঙ্গাদের মানব পাচারের বড় ঝুঁকিতে ফেলছে, যা তাদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাচারের শিকার হওয়াদের একটি বড় অংশ মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা। গত ২০২৫ সালে সাড়ে ৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে যাত্রা করে, যার মধ্যে আনুমানিক ৯০০ জন প্রাণ হারিয়েছে। সমুদ্রপথে যাত্রা করা এসব মানুষের প্রায় ৬৬ শতাংশই নারী ও শিশু। পাচারকারীরা সক্রিয় সিন্ডিকেট তৈরি করেছে এবং এমনকি কিছু বাংলাদেশিও তাদের ফাঁদে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা রোহিঙ্গাদের পাচার ও আন্দামান সাগরে মৃত্যু বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘসূত্রিতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। স্থানীয়দের জীবিকা সংকুচিত হচ্ছে, বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে এবং অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের চলাচল বাড়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। কিছু এনজিওর বিরুদ্ধে পাহাড় কেটে নতুন করে ক্যাম্প বানানোর ক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। ত্রাণের পণ্য স্থানীয় বাজারে কম দামে বিক্রি হওয়ায় স্থানীয় দোকানদারদের বিক্রি কমে যাচ্ছে এবং অন্যান্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি করছে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।

সুপারিশ: রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ক্রমবর্ধমান অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযান আরও জোরদার করতে হবে এবং অপরাধী গোষ্ঠীগুলোকে নির্মূল করার জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। এনজিওগুলোর কার্যক্রমের ওপর এনজিও বিষয়ক ব্যুরোকে আরও কঠোর নজরদারি এবং নিয়মিত অডিট পরিচালনা করতে হবে, যাতে তহবিল অপব্যবহার বা অনিয়মের কোনো সুযোগ না থাকে। বিশেষ করে, কর্মীদের বেতন থেকে কমিশন চাওয়ার মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মানব পাচার রোধে সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকায় নজরদারি বাড়ানো এবং পাচারকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা উচিত। একই সাথে, রোহিঙ্গাদের জন্য টেকসই জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি এবং তাদের প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া দ্রুততর করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে তারা হতাশা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষতিগ্রস্ত জীবিকা পুনরুদ্ধারে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


🔎 অনুসন্ধানে: আরাফাত হোসেন

আরাফাত হোসেন, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও এনজিও (NGO) অডিট।

Nessun commento trovato


News Card Generator