জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: ব্যক্তিগতকৃত ক্যান্সার চিকিৎসায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: ব্যক্তিগতকৃত ক্যান্সার চিকিৎসায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ড. আদনান সামি  avatar   
ড. আদনান সামি
জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: ব্যক্তিগতকৃত ক্যান্সার চিকিৎসায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: ব্যক্তিগতকৃত ক্যান্সার চিকিৎসায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২৩ সালের জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটে গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের উপর জোর দেওয়াকে একটি গুরুত্...

সম্প্রতি, ২০২৩ সালের জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটে গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের উপর জোর দেওয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও এই বরাদ্দ এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল, এটি ইঙ্গিত দেয় যে সরকার ব্যক্তিগতকৃত ক্যান্সার চিকিৎসায় জিনোমিক্স ও উন্নত প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছে। বিশেষত, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) এবং জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (এনআইসিআরএইচ)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে জিনোম সিকোয়েন্সিং এবং আণবিক রোগ নির্ণয় পদ্ধতির সীমিত পরিসরে প্রয়োগ শুরু হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আইইডিসিআর (IEDCR) কিছু সংক্রামক রোগের জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে নেতৃত্ব দিলেও, ক্যান্সার জিনোমিক্সে এর প্রয়োগ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশে ব্যক্তিগতকৃত ক্যান্সার চিকিৎসায় জিনোমিক্সের ব্যাপক প্রয়োগের সম্ভাবনা ও এর বাস্তবায়নে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

ক্যান্সার চিকিৎসায় জিনোমিক্স হলো রোগীর টিউমারের ডিএনএ-এর সম্পূর্ণ জেনেটিক মেকআপ বিশ্লেষণ করে তার জন্য সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করা। এটি প্রচলিত 'একই ঔষধ সবার জন্য' পদ্ধতির পরিবর্তে 'প্রত্যেক রোগীর জন্য নির্দিষ্ট ঔষধ' নীতির উপর ভিত্তি করে কাজ করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপাপটে, যেখানে ক্যান্সার একটি ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য সমস্যা, সেখানে এই প্রযুক্তি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, ২০৪০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। এই বিপুল সংখ্যক রোগীর জন্য প্রচলিত কেমোথেরাপি এবং রেডিওথেরাপি পদ্ধতির পাশাপাশি, ব্যক্তিগতকৃত থেরাপি (যেমন টার্গেটেড থেরাপি বা ইমিউনোথেরাপি) আরও কার্যকর ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন সমাধান দিতে পারে। তবে, এই প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অত্যাধুনিক জিনোম সিকোয়েন্সার, বায়োইনফরমেটিক্স প্ল্যাটফর্ম এবং দক্ষ মানবসম্পদের অভাব এই ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। বিশেষ করে, ডিজিএইচএস (DGHS)-এর অধীনে থাকা জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে আণবিক ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরি স্থাপনের বিষয়টি এখনো কল্পনাপ্রসূত। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ (NIMH) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে জিনোমিক্সের প্রাথমিক গবেষণা সীমিত পরিসরে চললেও, ক্যান্সার জিনোমিক্সে এর প্রয়োগ এখনো সুদূর পরাহত।

ব্যক্তিগতকৃত ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য নির্ভুল রোগ নির্ণয় অপরিহার্য। এর জন্য প্রয়োজন উন্নত বায়োমার্কার সনাক্তকরণ এবং লিকুইড বায়োপসি-এর মতো অ-আক্রমণকারী পদ্ধতির প্রসার। বাংলাদেশে বর্তমানে টিস্যু বায়োপসিই প্রধানত ব্যবহৃত হয়, যা জটিল এবং সবসময় রোগীর জন্য উপযোগী হয় না। এছাড়াও, জিনোমিক ডেটার নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বজায় রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ডিজিডিএ (DGDA) ঔষধ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জিনোমিক্স-ভিত্তিক ঔষধকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নীতিগত কাঠামো তৈরির প্রাথমিক আলোচনা শুরু করলেও, এর বাস্তবায়ন এখনো অনেক দূরে। অপরদিকে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় (MOHFW) জিনোমিক্স গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বললেও, সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও বাজেট বরাদ্দ এখনো অপ্রতুল। জিনোমিক ডেটা বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যার জন্য বায়োইনফরমেটিক্স বিশেষজ্ঞের তীব্র অভাব রয়েছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বায়োইনফরমেটিক্স কোর্স চালু হলেও, হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বিশেষজ্ঞের সংখ্যা খুবই নগণ্য। এই প্রযুক্তিকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে হলে, এর খরচ কমানো এবং স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থায় জিনোমিক পরীক্ষা ও ঔষধকে অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য। বর্তমানে, উচ্চ খরচের কারণে এই চিকিৎসা পদ্ধতি কেবলমাত্র উচ্চবিত্তদের জন্য সীমাবদ্ধ, যা জনস্বাস্থ্য সমতার পরিপন্থী।

সূচক ২০১৫ ২০২০ ২০২৫ (প্রাক্কলিত) ২০৩০ (প্রাক্কলিত)
ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা (লক্ষ) ১.৫ ১.৭ ২.২ ২.৮
জিনোম সিকোয়েন্সিং ল্যাব (সরকারি) ০ ২ (সীমিত সক্ষমতা) ৫ (সীমিত সক্ষমতা) ১০ (মাঝারি সক্ষমতা)
ব্যক্তিগতকৃত ক্যান্সার থেরাপি প্রাপ্ত রোগীর হার (%) ০.১ ০.৫ ২.০ ৫.০
ক্যান্সার গবেষণায় জিডিপির (%) ০.০০১ ০.০০২ ০.০০৫ ০.০১

উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর প্রাক্কলিত তথ্য এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন থেকে সংকলিত।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক একটি 'জাতীয় জিনোমিক্স নীতি' প্রণয়ন করা, যেখানে ক্যান্সার জিনোমিক্স গবেষণায় সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ, উন্নত ল্যাবরেটরি স্থাপন (বিশেষত IEDCR এবং NIMH-এর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলিতে), এবং বায়োইনফরমেটিক্স বিশেষজ্ঞ তৈরির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) কর্তৃক ব্যক্তিগতকৃত ক্যান্সার চিকিৎসায় ব্যবহৃত জিনোমিক্স-ভিত্তিক ঔষধ ও ডায়াগনস্টিক কিটসের দ্রুত অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি বিশেষ ফাস্ট-ট্র্যাক প্রক্রিয়া চালু করা এবং এর গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা।
  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) কর্তৃক দেশের প্রধান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে (যেমন বিএসএমএমইউ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল) অত্যাধুনিক আণবিক প্যাথলজি ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং ক্যান্সার রোগীদের জিনোমিক প্রোফাইলিং ডেটা সংরক্ষণের জন্য একটি সুরক্ষিত কেন্দ্রীয় ডেটাবেস তৈরি করা, যা রোগীর গোপনীয়তা আইন (Privacy Act) দ্বারা সুরক্ষিত থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. আদনান সামি

ড. আদনান সামি 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

کوئی تبصرہ نہیں ملا


News Card Generator