পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ

সায়েম মালিক  avatar   
সায়েম মালিক
পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'বাংলাদেশ পানি সম্পদ সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনা নীতি ২০২৪'-এর খসড়াটি দেশের পানিসম্পদ খাতে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের কৌ...

সম্প্রতি, পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত 'বাংলাদেশ পানি সম্পদ সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনা নীতি ২০২৪'-এর খসড়াটি দেশের পানিসম্পদ খাতে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের কৌশলগত দিকনির্দেশনা হিসেবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। এই নীতি, যা মূলত আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ এবং অভ্যন্তরীণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় একটি সমন্বিত কাঠামো প্রদানের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা একদিকে যেমন বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট ঝুঁকিগুলোও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর ভাঙন রোধে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) ও বিশ্বব্যাংকের মতো উন্নয়ন সহযোগীদের আগ্রহ সত্ত্বেও, আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা এবং উজানের দেশগুলির সাথে কার্যকর চুক্তি সম্পাদনের অনুপস্থিতি এই খাতের বিনিয়োগের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ শুধু অবকাঠামো নির্মাণেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলি খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট পানিস্বল্পতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ, BRRI সম্প্রতি এমন কয়েকটি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে যা তুলনামূলক কম পানি ব্যবহার করে উচ্চ ফলন দিতে সক্ষম, যেমন BRRI ধান ৮৮ এবং BRRI ধান ৯৫। এই জাতগুলো দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমাতে সহায়ক। তবে, এই গবেষণাগুলির বাণিজ্যিকীকরণ এবং কৃষকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন এবং কারিগরি সহায়তা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এই জাতগুলো মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে কাজ করলেও, আধুনিক সেচ প্রযুক্তি এবং পানি সাশ্রয়ী কৃষি পদ্ধতির প্রচারে আরও ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক নদীগুলির পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত না হলে, অভ্যন্তরীণ গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নতিও একতরফাভাবে কার্যকর হতে পারবে না।

আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগের ঝুঁকি বহুমাত্রিক। এর মধ্যে অন্যতম হলো উজানের দেশগুলির একতরফা পানি প্রত্যাহার বা বাঁধ নির্মাণ। গঙ্গা নদীর ফারাক্কা বাঁধের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ, যা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পরিবেশগত বিপর্যয় এবং কৃষি উৎপাদন হ্রাসে ভূমিকা রেখেছে। এই ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজন শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক উদ্যোগ, যা প্রায়শই দীর্ঘসূত্রিতা ও অনিশ্চয়তায় ভোগে। অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা এবং দীর্ঘমেয়াদী খরা পরিস্থিতি দেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সমন্বিত গবেষণা পরিকল্পনা প্রণয়নে কাজ করছে, যেখানে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলির পানির প্রবাহের পূর্বাভাস এবং জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল কৃষি পদ্ধতির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই বিনিয়োগের সম্ভাবনা তখনই পূর্ণতা পাবে যখন আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামো আরও শক্তিশালী হবে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তির মাধ্যমে পানির ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা যাবে। তাছাড়া, নদী খনন, ড্রেজিং এবং বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের টেকসইতা নিশ্চিত করতে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) এবং সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন (SIA) এর মতো প্রক্রিয়াগুলোকে আরও কঠোরভাবে অনুসরণ করা অপরিহার্য। এতে শুধু পরিবেশগত ক্ষতিই হ্রাস পাবে না, বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানও উন্নত হবে।

খাত বিনিয়োগের ক্ষেত্র লক্ষ্যমাত্রা (২০৩০ সাল নাগাদ) বর্তমান অগ্রগতি (২০২৩) প্রত্যাশিত রিটার্ন/সুবিধা
কৃষি পানি ব্যবস্থাপনা দক্ষ সেচ প্রযুক্তি (ড্রিপ, স্প্রিংকলার) ৫০% সেচ আওতাভুক্ত ১৫% ৩০% পানি সাশ্রয়, ১৫% ফলন বৃদ্ধি
নদী ড্রেজিং ও সুরক্ষা ৩,০০০ কিমি নদী খনন ও তীর সংরক্ষণ ১০০% ৪০% ২৫% বন্যা ঝুঁকি হ্রাস, নৌ-চলাচল বৃদ্ধি
লবণাক্ততা সহনশীল কৃষি ৫০% উপকূলীয় কৃষিজমি ৫০% ১০% ২০% খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি (লবণাক্ত এলাকায়)
ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ ৫০০টি রিচার্জ কাঠামো ১০০% ২০% ১০% ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বৃদ্ধি
আন্তঃসীমান্ত নদী গবেষণা ৫টি যৌথ গবেষণা প্রকল্প ১০০% ১টি (আংশিক) পানি বণ্টনে তথ্যভিত্তিক আলোচনা, আঞ্চলিক সহযোগিতা

উৎস: পরিবেশ মন্ত্রণালয়, DAE, BARI, BRRI এবং BARC এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও কার্যপত্র।

সুপারিশ

  • পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত 'বাংলাদেশ পানি সম্পদ সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনা নীতি ২০২৪'-এর চূড়ান্তকরণ এবং দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠন করা হোক, যার নেতৃত্বে থাকবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং এতে DAE, BARI, BRRI, BARC সহ সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এই টাস্কফোর্সকে প্রতি ৬ মাস অন্তর প্রকল্পের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জসমূহ পর্যালোচনা করে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা পেশ করতে হবে।
  • আন্তর্জাতিক নদীর পানি বণ্টনের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) এবং অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে একটি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ করুক। এই কৌশলের আওতায়, গঙ্গা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র সহ সকল অভিন্ন নদীর পানির ডেটা শেয়ারিং এবং যৌথ নদী কমিশন (JRC) এর কার্যকারিতা বাড়াতে নির্দিষ্ট সময়সীমা ভিত্তিক চুক্তি সম্পাদনের উপর জোর দিতে হবে।
  • BARI, BRRI এবং BARC-এর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলিতে পানি সাশ্রয়ী ফসল জাত উদ্ভাবন এবং জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল কৃষি প্রযুক্তির গবেষণায় বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ কমপক্ষে ১৫% বৃদ্ধি করা হোক। পাশাপাশি, DAE-কে মাঠ পর্যায়ে এই প্রযুক্তিগুলির সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় জনবল ও আধুনিক প্রশিক্ষণ দিয়ে সজ্জিত করতে হবে, যার জন্য 'জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৮' এর আওতায় একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা যেতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সায়েম মালিক

সায়েম মালিক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nema komentara


News Card Generator