ঘরোয়া ক্রিকেটের অদৃশ্য আর্থিক স্রোত: পাইপলাইনের পুঁজি আসে কোথা থেকে? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ঘরোয়া ক্রিকেটের অদৃশ্য আর্থিক স্রোত: পাইপলাইনের পুঁজি আসে কোথা থেকে?

নাবিল কায়সার  avatar   
নাবিল কায়সার
ঘরোয়া ক্রিকেটের অদৃশ্য আর্থিক স্রোত: পাইপলাইনের পুঁজি আসে কোথা থেকে?
ঘরোয়া ক্রিকেটের অদৃশ্য আর্থিক স্রোত: পাইপলাইনের পুঁজি আসে কোথা থেকে?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষের জন্য তাদের বার্ষিক বাজেট ঘোষণা করেছে, যেখানে ঘরোয়া ক্রিকেট অবকাঠামো এবং পাইপলাইন উন্নয়নে প্রায় ৩০...

সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষের জন্য তাদের বার্ষিক বাজেট ঘোষণা করেছে, যেখানে ঘরোয়া ক্রিকেট অবকাঠামো এবং পাইপলাইন উন্নয়নে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের উৎস এবং এর স্বচ্ছতা নিয়ে ক্রীড়া মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, যখন তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসা প্রতিভাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং প্রশিক্ষণের মান উন্নয়নে দীর্ঘদিনের ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে, তখন এই অদৃশ্য আর্থিক স্রোতের উৎস ও তার প্রবাহ বিশ্লেষণ করা অত্যাবশ্যক। বিসিবি'র এই বাজেট বরাদ্দের সিংহভাগই আসে মূলত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব, সরকারি অনুদান এবং স্পন্সরশিপ চুক্তি থেকে। কিন্তু এই অর্থ কিভাবে জেলা ও বিভাগীয় ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনগুলোতে বন্টন হয় এবং এর প্রকৃত সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, তা এখনো একটি জটিল ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া হিসেবেই বিবেচিত। উদাহরণস্বরূপ, জেলা পর্যায়ের ক্লাবগুলো প্রায়শই আর্থিক সংকটে ভোগে, যা তরুণ ক্রিকেটারদের বিকাশে সরাসরি বাধা সৃষ্টি করে।

ঘরোয়া ক্রিকেটের আর্থিক কাঠামো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেওয়া নিয়মিত অনুদান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে, এই অনুদান সাধারণত অবকাঠামো উন্নয়ন বা বড় টুর্নামেন্ট আয়োজনে ব্যবহৃত হলেও, পাইপলাইন ডেভেলপমেন্টে এর সরাসরি প্রভাব সীমিত। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অর্জিত বিসিবির নিজস্ব রাজস্ব, যেমন টেলিভিশন স্বত্ব, স্পন্সরশিপ এবং ম্যাচ ফি থেকে প্রাপ্ত আয়, ঘরোয়া ক্রিকেটের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। ২০২৩ সালে বিসিবি'র প্রধান পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের সাথে স্বাক্ষরিত প্রায় ৫০০ কোটি টাকার চুক্তি এই রাজস্ব প্রবাহকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তুলেছে। কিন্তু এই বর্ধিত রাজস্বের কতটা অংশ তৃণমূল পর্যায়ে, বিশেষ করে স্কুল ক্রিকেট, বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা এবং মহিলা ক্রিকেটের উন্নয়নে সরাসরি ব্যয় হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব প্রায়শই অনুপস্থিত। অনেক ক্ষেত্রে, এই অর্থ উচ্চ-স্তরের টুর্নামেন্টের পুরস্কার বিতরণী বা প্রশাসনিক ব্যয়ের খাতে চলে যায়, যা মাঠ পর্যায়ের ক্রিকেটারদের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ বা পুষ্টির মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়।

পাইপলাইন ফিনান্সিংয়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকাও অনস্বীকার্য। বিশ্ব ব্যাংক (World Bank) এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) সরাসরি খেলাধুলা খাতে ঋণ বা অনুদান না দিলেও, পরোক্ষভাবে যুব উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে তাদের প্রকল্পগুলো ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পে World Bank-এর 'এনহ্যান্সিং স্কিলস ফর গ্রোথ' (ESFG) প্রকল্পের অধীনে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন বা যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিনিয়োগ করা হতে পারে, যা পরোক্ষভাবে ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। ADB'র 'সাসটেইনেবল আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম' এর আওতায় যখন নগরীয় অবকাঠামো উন্নত করা হয়, তখন খেলার মাঠ বা স্টেডিয়ামের আধুনিকায়নেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে, এই ধরনের পরোক্ষ অর্থায়নকে সরাসরি ঘরোয়া ক্রিকেটের পাইপলাইনে আনা এবং এর সুনির্দিষ্ট ব্যবহার নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের ক্রীড়া বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকার প্রতি বছর ক্রীড়া খাতে একটি নির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখে, যা বিভিন্ন ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে বন্টন করা হয়। এই বন্টন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা এবং প্রতিটি টাকার হিসাব নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে মাঠের ক্রিকেটাররা এর সুফল ভোগ করতে পারে।

উৎস ২০২২-২৩ অর্থবছর (কোটি টাকা) ২০২৩-২৪ অর্থবছর (কোটি টাকা) পরিবর্তন (%)
বিসিবি নিজস্ব রাজস্ব (স্পন্সরশিপ, টিভি স্বত্ব) ৪৫০ ৫৫০ +২২.২২%
আইসিসি থেকে প্রাপ্ত তহবিল ১৮০ ২০০ +১১.১১%
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় (সরকারি অনুদান) ৫০ ৫৫ +১০.০০%
ঘরোয়া টুর্নামেন্ট স্পন্সরশিপ ৮০ ৯৫ +১৮.৭৫%
মোট আনুমানিক তহবিল ৭৬০ ৯০০ +১৮.৪৩%

উৎস: বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) বার্ষিক প্রতিবেদন, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় বাজেট দলিল

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেবে, জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'পারফরম্যান্স-ভিত্তিক তহবিল বন্টন নীতি' প্রণয়ন করতে। এই নীতিতে ক্লাব ও অ্যাকাডেমিগুলোর মাঠ পর্যায়ের কার্যকারিতা, তরুণ ক্রিকেটারদের উৎপাদন হার, এবং মহিলা ক্রিকেটে অংশগ্রহণের ভিত্তিতে তহবিল বরাদ্দ করা হবে, যা প্রতি বছর একটি স্বাধীন নিরীক্ষা সংস্থা (যেমন: মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়) দ্বারা নিরীক্ষিত হবে।
  • World Bank এবং ADB-এর চলমান ও ভবিষ্যৎ 'যুব উন্নয়ন' এবং 'মানব সম্পদ উন্নয়ন' প্রকল্পগুলোর সাথে বিসিবি'র পাইপলাইন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামকে সমন্বিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (যেমন: অর্থ মন্ত্রণালয়) একটি যৌথ কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করবে। এই কমিটি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তাকে সরাসরি তৃণমূল ক্রিকেট প্রশিক্ষক এবং অবকাঠামো উন্নয়নে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তার একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করবে এবং প্রতি ছয় মাস অন্তর অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।
  • বিসিবিকে অবশ্যই একটি 'ডিজিটাল আর্থিক স্বচ্ছতা পোর্টাল' চালু করতে হবে, যেখানে পাইপলাইন ক্রিকেটের জন্য বরাদ্দকৃত প্রতিটি অর্থের উৎস, বন্টন, এবং ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এই পোর্টালে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ক্লাবগুলো প্রাপ্ত অনুদান এবং তার ব্যবহারের ছবি ও বিলের কপি আপলোড করবে, যা বাংলাদেশ সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ভিশনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিল কায়সার

নাবিল কায়সার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বাংলাদেশ ক্রিকেট ও পাইপলাইন ফিন্যান্স। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator