জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: সাইবার নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয়… | আই নিউজ বিডি

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: সাইবার নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের নতুন দ্বন্দ্ব?

তানিয়া সুলতানা  avatar   
তানিয়া সুলতানা
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: সাইবার নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের নতুন দ্বন্দ্ব?
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: সাইবার নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের নতুন দ্বন্দ্ব?
ছবি: সংগৃহীত
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ (UN General Assembly) সম্প্রতি সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক একটি নতুন রেজোলিউশন (A/RES/78/241) গ্রহণ করেছে, যা সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সাইবার স্...

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ (UN General Assembly) সম্প্রতি সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক একটি নতুন রেজোলিউশন (A/RES/78/241) গ্রহণ করেছে, যা সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সাইবার স্পেসে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে উৎসাহিত করে। কিন্তু এই রেজোলিউশন সত্ত্বেও, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সাইবার হামলা এবং পাল্টা হামলার ক্রমবর্ধমান ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনের সনাতন কাঠামোতে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ধারণাকে নতুন করে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, যেখানে অদৃশ্য হামলাকারী এবং ভৌগোলিক সীমারেখা অস্পষ্ট।

সাইবার হামলা এখন আর কেবল তথ্য চুরি বা ব্যক্তিগত ডেটা লঙ্ঘনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো যেমন বিদ্যুৎ গ্রিড, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ককে লক্ষ্যবস্তু করছে। আন্তর্জাতিক আইন, যা মূলত ভৌগোলিক সীমানা এবং সামরিক শক্তির সুস্পষ্ট প্রয়োগের ওপর ভিত্তি করে গঠিত, তা এই ডিজিটাল যুগে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের সূক্ষ্ম এবং জটিল রূপগুলোকে মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে। জাতিসংঘের সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ, যা বলপ্রয়োগ বা বলপ্রয়োগের হুমকির বিরুদ্ধে নির্দেশিকা দেয়, তা সাইবার হামলার ক্ষেত্রে কতটা প্রযোজ্য হবে তা নিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তীব্র মতানৈক্য বিদ্যমান। কিছু রাষ্ট্র সাইবার হামলাকে 'সশস্ত্র আক্রমণ' হিসেবে গণ্য করার পক্ষে, যা আত্মরক্ষার অধিকারকে সক্রিয় করে তোলে, আবার অন্যরা মনে করে যে, এর জন্য ক্ষতির মাত্রা এবং উদ্দেশ্য আরও সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা প্রয়োজন। এই বিতর্কের ফলস্বরূপ, সাইবার স্পেসে রাষ্ট্রীয় আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী কোনো সর্বজনীনভাবে গৃহীত আইনি কাঠামো এখনও অনুপস্থিত, যা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস ও সাইবার অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে উস্কে দিচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সাইবার হামলার মূল সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো 'অ্যাট্রিবিউশন' বা হামলাকারীর উৎস চিহ্নিতকরণ। জটিল কারিগরি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হামলাকারীরা তাদের পরিচয় গোপন করতে সক্ষম হয়, যার ফলে আক্রান্ত রাষ্ট্র প্রায়শই নিশ্চিতভাবে কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে দোষারোপ করতে পারে না। এই অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে এবং প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের ঝুঁকি বাড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, UN Peacekeeping মিশনগুলো প্রায়শই সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে পরিচালিত হয়, যেখানে সাইবার হামলা তাদের কার্যক্রমকে ব্যাহত করতে পারে, যেমন যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করা বা ডেটা চুরি করা। এমন পরিস্থিতিতে, একটি শান্তি মিশনের বিরুদ্ধে সাইবার হামলার জন্য দায়ী রাষ্ট্রকে চিহ্নিত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতিসংঘ সাইবার বিশেষজ্ঞদের একটি উন্মুক্ত ওয়ার্কিং গ্রুপ (Open-ended Working Group - OEWG) গঠন করেছে, যা সাইবার স্পেসে রাষ্ট্রীয় আচরণের নিয়মাবলী এবং আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপ (Confidence-Building Measures) নিয়ে আলোচনা করছে, কিন্তু সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় স্বার্থ এবং প্রযুক্তির সক্ষমতার তারতম্য একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তৈরিতে প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে।

আঞ্চলিক সংস্থাগুলোও এই জটিলতা থেকে মুক্ত নয়। BIMSTEC (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) এবং সার্ক (দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা) এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলো তাদের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। BIMSTEC দেশগুলোর মধ্যে সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে পারস্পরিক সহায়তার জন্য একটি কাঠামো তৈরির আলোচনা চলছে, যা সাইবার হুমকির বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উপর জোর দেয়। অনুরূপভাবে, সার্ক দেশগুলোও সাইবার অপরাধ দমনে আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে, কিন্তু রাজনৈতিক বিভেদ এবং পারস্পরিক আস্থার অভাব কার্যকর আঞ্চলিক চুক্তি স্বাক্ষরের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এই আঞ্চলিক উদ্যোগগুলো জাতিসংঘের বৈশ্বিক প্রচেষ্টার পরিপূরক হতে পারে, তবে তাদের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আঞ্চলিক পর্যায়ে সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা ও প্রোটোকল তৈরি করা সম্ভব হলেও, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের উপর সাইবার হামলার প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগের বিষয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ আঞ্চলিক অবস্থান তৈরি করা এখনও কঠিন, যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

বছর জাতিসংঘে সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত রেজোলিউশন বৈশ্বিক সাইবার হামলার ঘটনা (লক্ষ) রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হামলার অনুমিত শতাংশ
২০১৮ ১ (A/RES/73/27) ৩.৫ ১০%
২০১৯ ২ (A/RES/74/247) ৪.৮ ১২%
২০২০ ১ (A/RES/75/240) ৬.২ ১৫%
২০২১ ১ (A/RES/76/19) ৭.৭ ১৮%
২০২২ ২ (A/RES/77/37) ৯.৫ ২০%
২০২৩ ১ (A/RES/78/241) ১১.৩ ২২%

উৎস: UN Office for Disarmament Affairs (UNODA), Cybersecurity Ventures, এবং বিভিন্ন সাইবার নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জাতিসংঘের সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক উন্মুক্ত ওয়ার্কিং গ্রুপ (OEWG) এবং সরকারি বিশেষজ্ঞদের গ্রুপ (GGE) উভয় ফোরামে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, এবং সাইবার হামলার 'অ্যাট্রিবিউশন' (হামলাকারীর উৎস চিহ্নিতকরণ) এর জন্য আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত মানদণ্ড ও প্রক্রিয়া প্রণয়নে সমর্থন জানাতে হবে, যা সাইবার স্পেসে রাষ্ট্রীয় আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক আইন কাঠামো তৈরিতে সহায়ক হবে।
  • UN Peacekeeping অপারেশনগুলোতে সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রশমনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'জাতিসংঘ সাইবার নিরাপত্তা প্রোটোকল' (UN Cybersecurity Protocol) প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিতে হবে, যেখানে মিশনগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা, ডেটা সুরক্ষা এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণের উপর জোর দেওয়া হবে, এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে এই প্রোটোকল মেনে চলার জন্য বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হবে।
  • BIMSTEC এবং সার্কের মতো আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য 'আঞ্চলিক সাইবার নিরাপত্তা চুক্তি' (Regional Cybersecurity Accord) স্বাক্ষরের উদ্যোগ নিতে হবে, যা তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ সাইবার মহড়া, এবং সাইবার অপরাধ দমনে পারস্পরিক আইনি সহায়তার বিধান অন্তর্ভুক্ত করবে, এবং এই চুক্তির অধীনে একটি 'আঞ্চলিক সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র' (Regional Cybersecurity Center) প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানিয়া সুলতানা

তানিয়া সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

לא נמצאו הערות


News Card Generator