কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য: শ্রম আইনে 'মানসিক চাপ'-এর সংজ্ঞায়ন ও ক্ষতিপূরণের অধিকার | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য: শ্রম আইনে 'মানসিক চাপ'-এর সংজ্ঞায়ন ও ক্ষতিপূরণের অধিকার

অ্যাডভোকেট তানিয়া  avatar   
অ্যাডভোকেট তানিয়া
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য: শ্রম আইনে 'মানসিক চাপ'-এর সংজ্ঞায়ন ও ক্ষতিপূরণের অধিকার
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য: শ্রম আইনে 'মানসিক চাপ'-এর সংজ্ঞায়ন ও ক্ষতিপূরণের অধিকার
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে, বিশেষত যখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) দেশের কর্মজীবী জনগোষ্ঠ...

সম্প্রতি, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে, বিশেষত যখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) দেশের কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর মানসিক সুস্থতার ওপর একটি প্রাথমিক সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করে। এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৩০% কর্মজীবী কোনো না কোনো মাত্রার মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা বিষণ্ণতায় ভুগছেন, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরাসরি কর্মপরিবেশের সাথে সম্পর্কিত। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি দেশের উৎপাদনশীলতা, শ্রমিকের অধিকার এবং সামাজিক সুরক্ষার উপর গভীর প্রভাব বিস্তারকারী একটি গুরুতর সমস্যাকে নির্দেশ করে। বিশেষ করে, শ্রম আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে ‘মানসিক চাপ’ বা ‘সাইকোলজিক্যাল ইনজুরি’কে পেশাগত রোগের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি এখনো অস্পষ্ট রয়ে গেছে, যা ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির অধিকারকে জটিল করে তুলছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই ধরনের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যকে একটি জনস্বাস্থ্য বিষয়ক জরুরি অবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করার প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে শ্রম আইনে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথ প্রশস্ত করতে পারে।

বাংলাদেশের শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) মূলত শারীরিক আঘাত, দুর্ঘটনা এবং কিছু নির্দিষ্ট পেশাগত রোগের (যেমন: সিলিকোসিস, অ্যাসবেস্টোসিস) উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। এই আইনে ‘মানসিক চাপ’ বা ‘মানসিক অসুস্থতা’কে পেশাগত রোগ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান নেই। ফলে, কর্মক্ষেত্রে চরম মানসিক চাপ, হয়রানি, বা প্রতিকূল পরিবেশের কারণে সৃষ্ট মানসিক অসুস্থতার শিকার কর্মীরা প্রায়শই ক্ষতিপূরণ বা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। উদাহরণস্বরূপ, একজন কর্মী যদি কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাজের চাপ, ক্রমাগত হয়রানি, বা নিরাপত্তাহীনতার কারণে তীব্র বিষণ্ণতা বা উদ্বেগজনিত রোগে আক্রান্ত হন, তবে বর্তমান আইনি কাঠামোর অধীনে এটিকে সরাসরি ‘পেশাগত রোগ’ হিসেবে প্রমাণ করা এবং সে অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দাবি করা অত্যন্ত কঠিন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যকে জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে চিহ্নিত করলেও, বাংলাদেশের শ্রম আইন এখনও এই আধুনিক ধারণার সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (NIMH) এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৭% মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, যার একটি বড় অংশ কর্মজীবীরা। এই সমস্যাগুলোকে পেশাগত রোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করলে, এটি কেবল ব্যক্তির জীবনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই পরিপ্রেক্ষিতে, শ্রম আইনে ‘মানসিক চাপ’কে পেশাগত রোগ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার এবং এর জন্য ক্ষতিপূরণের অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হয়ে উঠেছে।

কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য একটি সমন্বিত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা জরুরি। বর্তমানে, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) মানসিক স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট ঔষধের মান নিয়ন্ত্রণ করলেও, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা প্রতিরোধে এর সরাসরি ভূমিকা সীমিত। একইভাবে, DGHS, MOHFW এবং IEDCR এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো জনস্বাস্থ্য বিষয়ক নীতি ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, শ্রম আইনের সুনির্দিষ্ট প্রয়োগে তাদের সরাসরি ক্ষমতা কম। এই শূন্যতা পূরণের জন্য প্রয়োজন শ্রম আইন সংস্কার এবং কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য একটি স্বতন্ত্র নীতিমালা প্রণয়ন। এই নীতিমালায় মানসিক চাপ, হয়রানি (বুলিং, মববিং) এবং কর্মপরিবেশের কারণে সৃষ্ট অন্যান্য মানসিক অসুস্থতার সুস্পষ্ট সংজ্ঞা, রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি, এবং ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। এছাড়া, কর্মস্থলে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদানের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা যেতে পারে। এটি কর্মপরিবেশকে আরও মানবিক ও উৎপাদনশীল করে তুলবে এবং কর্মীদের অধিকার রক্ষা করবে। কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব না দিলে, তা দীর্ঘমেয়াদে কর্মীদের কর্মদক্ষতা হ্রাস, অনুপস্থিতি বৃদ্ধি এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

প্রতিষ্ঠানের নাম ভূমিকা/কার্যক্রম প্রাসঙ্গিক তথ্য/সিদ্ধান্ত (সর্বশেষ প্রাপ্ত)
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) জনস্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। ২০২৩ সালে কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রাথমিক সমীক্ষায় প্রায় ৩০% কর্মজীবীর মানসিক চাপ/উদ্বেগ চিহ্নিতকরণ।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি ও কৌশল প্রণয়ন, মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮ এর বাস্তবায়ন। মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮ (কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরাসরি বিধান অনুপস্থিত)।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) রোগের কারণ ও বিস্তার নিয়ে গবেষণা, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সুপারিশ। কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণ ও প্রভাব নিয়ে গবেষণার প্রস্তাবনা (২০২৩)।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (NIMH) মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদান, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ। দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৭% মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন (২০১৯ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী)।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) ঔষধের মান নিয়ন্ত্রণ ও লাইসেন্স প্রদান। মানসিক রোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত ঔষধের মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ।

উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW), ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (NIMH), রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR), ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এর প্রকাশিত প্রতিবেদন ও নীতিমালা।

সুপারিশ

  • শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) এর ধারা ২(ঙ) (পেশাগত রোগ) এবং ধারা ১৪৮ (ক্ষতিপূরণ) সংশোধন করে 'মানসিক চাপ' বা 'সাইকোলজিক্যাল ইনজুরি'কে সুনির্দিষ্টভাবে পেশাগত রোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হোক, এবং এর কারণ, নির্ণয়ের পদ্ধতি ও ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হোক, যা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এর তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি দ্বারা প্রণীত হতে পারে।
  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (NIMH) এর যৌথ উদ্যোগে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক একটি জাতীয় গাইডলাইন বা নীতিমালা প্রণয়ন করা হোক, যেখানে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব, নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং, এবং মনো-সামাজিক সহায়তা প্রদানের বাধ্যবাধকতা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) কে কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ ও এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে নিয়মিত ও বিস্তারিত গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট ও জনবল বরাদ্দ দেওয়া হোক, যাতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে শ্রম আইন ও নীতিমালায় আরও কার্যকর সংশোধনী আনা সম্ভব হয় এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) মানসিক স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট ঔষধের সহজলভ্যতা ও মান নিশ্চিত করতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট তানিয়া

অ্যাডভোকেট তানিয়া 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও শ্রম আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

کوئی تبصرہ نہیں ملا


News Card Generator