গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ: সম্ভাবনা ও নীতিগত প্রতিবন্ধকতা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ: সম্ভাবনা ও নীতিগত প্রতিবন্ধকতা

ড. সায়মা হুদা  avatar   
ড. সায়মা হুদা
গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ: সম্ভাবনা ও নীতিগত প্রতিবন্ধকতা
গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ: সম্ভাবনা ও নীতিগত প্রতিবন্ধকতা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ মোট ব্যয়ের ১ শতাংশেরও কম। যেখানে উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই হার ১০-১৫ শতাংশ বা তারও বেশি, সেখানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই চিত্র দেশের উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বেসরকারি খাতের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। এই স্বল্প বিনিয়োগ শুধু উচ্চশিক্ষার মানকেই প্রভাবিত করছে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনেও বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

বেসরকারি R&D খাতে বিনিয়োগের এই স্বল্পতা শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় সীমাবদ্ধ নয়; শিল্প খাতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। যদিও বাংলাদেশ সরকার জাতীয় শিল্পনীতিতে উদ্ভাবন ও গবেষণাকে গুরুত্ব দিচ্ছে, বাস্তবে বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর R&D ব্যয় নামমাত্র। ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) তাদের বিভিন্ন কর্মশালার মাধ্যমে শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে R&D সংক্রান্ত সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরলেও, কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে তা এখনও গতি পাচ্ছে না। অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানই স্বল্পমেয়াদী মুনাফাকে অগ্রাধিকার দেয় এবং নিজস্ব R&D ইউনিট স্থাপন বা বিদ্যমান গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে অংশীদারিত্বে বিনিয়োগ করতে অনাগ্রহী। এর অন্যতম কারণ হলো, R&D বিনিয়োগের বিপরীতে তাৎক্ষণিক রিটার্নের অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণার অভাব। উপরন্তু, R&D-এর জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চদক্ষতাসম্পন্ন গবেষক ও প্রকৌশলীর সংকটও একটি বড় কারণ। দেশের কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং SEIP (Skills for Employment Investment Program) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করলেও, উচ্চতর গবেষণা ও উদ্ভাবনে সক্ষম মানবসম্পদ তৈরিতে এখনও যথেষ্ট জোর দেওয়া হচ্ছে না। ফলে, শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই প্রযুক্তি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা স্থানীয় উদ্ভাবনকে নিরুৎসাহিত করছে।

এই নীতিগত প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা না গেলে, বাংলাদেশের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে উত্তরণের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। R&D খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য একদিকে যেমন সরকারের পক্ষ থেকে আকর্ষণীয় প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন, তেমনি অন্যদিকে একটি কার্যকর ইকোসিস্টেম তৈরি করা অপরিহার্য। BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শাখায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও, তাদের গবেষণার সুযোগ সীমিত। সরকারি গবেষণা তহবিল অপ্রতুল হওয়ায় বেসরকারি বিনিয়োগের ভূমিকা এখানে অনস্বীকার্য। কিন্তু, গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক ল্যাবরেটরি, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশনার জন্য পর্যাপ্ত সমর্থন বেসরকারি খাত থেকে আসছে না। R&D-এর জন্য সুনির্দিষ্ট ট্যাক্স বেনিফিট, কাস্টমস ডিউটি মওকুফ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সহজ নীতিমালার অভাব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই খাতে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে। উপরন্তু, মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ ও বাণিজ্যিকীকরণের দুর্বল কাঠামোও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ তাদের উদ্ভাবিত পণ্যের কপিরাইট বা প্যাটেন্ট সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।

খাত মোট ব্যয়ের R&D অংশ (%) (২০২১-২২) তুলনামূলক আন্তর্জাতিক মান (%)
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় (বাংলাদেশ) ০.৬২% ৫-১০%
বেসরকারি শিল্প (বাংলাদেশ) ০.৪% (আনুমানিক) ২-৫%
উন্নত দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয় (গড়) ১০-১৫% ১০-১৫%

উৎস: ইউজিসি বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২১-২২), বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও উন্নয়ন সূচক।

সুপারিশ

  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের উপর বিদ্যমান কর্পোরেট ট্যাক্স ১০% থেকে কমিয়ে ৫% এ নামিয়ে আনা এবং R&D-এর জন্য আমদানিকৃত যন্ত্রপাতির উপর সকল প্রকার কাস্টমস ডিউটি ও ভ্যাট মওকুফ করে একটি সুনির্দিষ্ট প্রজ্ঞাপন জারি করা।
  • শিল্প মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসি যৌথ উদ্যোগে একটি "ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া R&D ইনোভেশন ফান্ড" গঠন করা, যেখানে বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর R&D প্রকল্পে বিনিয়োগের বিপরীতে সরকার থেকে ম্যাচিং গ্রান্ট (যেমন, ১:১ বা ১:২ অনুপাতে) প্রদান করা হবে এবং এই ফান্ডের ব্যবস্থাপনা ও তদারকির দায়িত্ব NSDA-কে দেওয়া।
  • পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরকে (DPDT) শক্তিশালী করে R&D থেকে প্রাপ্ত উদ্ভাবনের মেধাস্বত্ব সুরক্ষার প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও সহজীকরণ করা এবং মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে বিদ্যমান কপিরাইট আইন ও প্যাটেন্ট আইন সংশোধন করা, যাতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা তাদের উদ্ভাবনের বাণিজ্যিকীকরণে নিরাপত্তা অনুভব করেন।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. সায়মা হুদা

ড. সায়মা হুদা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

نظری یافت نشد


News Card Generator