স্মার্ট সিটি ও ডেটা প্রাইভেসি: ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে অনিয়ম ও ঝুঁকির চিত্র | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

স্মার্ট সিটি ও ডেটা প্রাইভেসি: ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে অনিয়ম ও ঝুঁকির চিত্র

সাদমান সাকিব  avatar   
সাদমান সাকিব
স্মার্ট সিটি ও ডেটা প্রাইভেসি: ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে অনিয়ম ও ঝুঁকির চিত্র
স্মার্ট সিটি ও ডেটা প্রাইভেসি: ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে অনিয়ম ও ঝুঁকির চিত্র
ছবি: সংগৃহীত
স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে দেশজুড়ে যখন ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, তখন ডেটা প্রাইভেসি এবং স্মার্ট সিটি প্রকল্পগুলোতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ...

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে দেশজুড়ে যখন ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, তখন ডেটা প্রাইভেসি এবং স্মার্ট সিটি প্রকল্পগুলোতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। 'আই নিউজ বিডি'-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডিজিটাল বাংলাদেশের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যাপক অপচয় ও দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। এই খাতগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব দেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এবং স্মার্ট নগরীর ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ডেটা ফাঁসের ঘটনা দেশের ডেটা সুরক্ষার ভঙ্গুর চিত্র স্পষ্ট করেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পেয়েছে যে, তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ পাঁচটি প্রতিষ্ঠান তৃতীয় পক্ষের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ফাঁস করেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ইউসিবি ব্যাংকের উপায়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আইবাস। এই ঘটনায় জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিস (শোকজ) জারি করা হয়েছে। এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসেও এনআইডির তথ্যভান্ডারে থাকা নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য আবারও ফাঁস হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে ভূমি মন্ত্রণালয়কে সন্দেহভাজন হিসেবে তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল ইসি। ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (ভিডিপি) এবং ব্র্যাক ব্যাংক থেকেও এনআইডি তথ্য ফাঁসের প্রমাণ পাওয়ায় তাদের সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই ডেটা সুরক্ষায় গুরুতর দুর্বলতা বিদ্যমান, যা নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

স্মার্ট সিটি প্রকল্পগুলো ডেটা সংগ্রহের এক বিশাল ক্ষেত্র তৈরি করছে, কিন্তু এসব ডেটার সুরক্ষা নিয়ে রয়েছে ব্যাপক উদ্বেগ। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শহরে স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল ইউটিলিটি সার্ভিসেস এবং অন্যান্য স্মার্ট সিটি উদ্যোগের মাধ্যমে প্রচুর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে, এই ডেটা কীভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে, সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং ব্যবহার করা হচ্ছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছ নীতিমালার অভাব রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্মার্ট সিটি প্রকল্পগুলোতে ডেটা প্রাইভেসি এবং নিরাপত্তার বিষয়টি প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে, যা নাগরিকদের নজরদারি এবং ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২২ সালে 'উপাত্ত সুরক্ষা আইন'-এর খসড়া নিয়ে তাদের পর্যালোচনামূলক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল যে, এই আইনের খসড়ায় ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার বিষয়টি অস্পষ্ট এবং এলোমেলোভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা অপব্যবহারের আশঙ্কা বাড়ায়। যদিও ২০২৫ সালের অক্টোবরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুমোদন করা হয়েছে, যা নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য আরও সুরক্ষিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে, সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ (যা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পরিবর্তিত রূপ) এর অপব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের নামে বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতির চিত্রও স্পষ্ট। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনকালে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' নির্মাণ এবং পরবর্তীতে '২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার লক্ষ্যে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে, যার মধ্যে নতুনত্বের সুযোগ নিয়ে প্রকল্পের নামে বিপুল অর্থ লোপাট করা হয়েছে। শ্বেতপত্র প্রণয়নে গঠিত কমিটি আইসিটি খাতকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং অভ্যন্তরীণ তদন্তে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে আরেকটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আট জেলায় 'আইটি ট্রেনিং ও ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন' প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ ও ভবন নির্মাণে বাড়তি খরচসহ প্রায় ৫৩৪ কোটি টাকা অপচয় হয়েছে। এই অনিয়মগুলো প্রমাণ করে যে, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও তার সুফল জনগণ পুরোপুরি পাচ্ছে না এবং দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রের সম্পদ অপচয় হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি দেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ডেটা ফাঁস, ডেটা সুরক্ষায় দুর্বলতা এবং স্মার্ট সিটি প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতার অভাব নাগরিকদের আস্থা নষ্ট করছে এবং তাদের ডিজিটাল অধিকার খর্ব করছে। বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়ার ঘটনা (যেমন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ১০ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর তথ্য ফাঁস) অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া তথ্য প্রকাশ এবং ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন-২০২৬ এর লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই সমস্যাগুলো মোকাবিলা না করতে পারলে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন কেবল একটি স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, যা নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা ও সুবিধার পরিবর্তে ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা বয়ে আনবে।

সুপারিশ: ডেটা প্রাইভেসি এবং স্মার্ট সিটি প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং এর অধীনে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ গঠন করা অপরিহার্য, যা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারবে। দ্বিতীয়ত, স্মার্ট সিটি প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং ডেটা সংগ্রহ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি কঠোর ডেটা গভর্নেন্স ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে হবে, যেখানে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং সম্মতির বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। তৃতীয়ত, এনআইডি ডেটা ফাঁসসহ সকল ডেটা লঙ্ঘনের ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক তদন্ত নিশ্চিত করে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবং সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করতে হবে। চতুর্থত, ডিজিটাল ও স্মার্ট বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট সকল প্রকল্পে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে অর্থ অপচয় রোধে কঠোর নজরদারি ও অডিট ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পরিশেষে, নাগরিকদের মধ্যে ডেটা সুরক্ষা এবং ডিজিটাল অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত, যাতে তারা তাদের তথ্যের নিরাপত্তা সম্পর্কে অবগত থাকতে পারে এবং প্রয়োজনে প্রতিকার চাইতে পারে।


🔎 অনুসন্ধানে: সাদমান সাকিব

সাদমান সাকিব, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: স্মার্ট সিটি ও ডেটা প্রাইভেসি।

Geen reacties gevonden


News Card Generator