ঘরোয়া স্পোর্টস একাডেমি: জেলা পর্যায়ে প্রতিভার অপচয়, কেন বদলাচ্ছে না চিত্র? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ঘরোয়া স্পোর্টস একাডেমি: জেলা পর্যায়ে প্রতিভার অপচয়, কেন বদলাচ্ছে না চিত্র?

কামরুল ইসলাম  avatar   
কামরুল ইসলাম
ঘরোয়া স্পোর্টস একাডেমি: জেলা পর্যায়ে প্রতিভার অপচয়, কেন বদলাচ্ছে না চিত্র?
ঘরোয়া স্পোর্টস একাডেমি: জেলা পর্যায়ে প্রতিভার অপচয়, কেন বদলাচ্ছে না চিত্র?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সেমিনারে দেশের জেলাভিত্তিক ক্রীড়া অবকাঠামোর নাজুক চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে দেখা গেছে, প্রায় ৪০টি জেলায় এখনো আন্তর্...

সম্প্রতি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সেমিনারে দেশের জেলাভিত্তিক ক্রীড়া অবকাঠামোর নাজুক চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে দেখা গেছে, প্রায় ৪০টি জেলায় এখনো আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম বা আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নেই। এই সীমাবদ্ধতা জেলা পর্যায় থেকে উঠে আসা সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদদের জন্য একটি বিরাট প্রতিবন্ধকতা, যা তাদের প্রতিভা বিকাশে সরাসরি বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে, গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার তরুণদের মধ্যে অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে তাদের স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হচ্ছে। এটি কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ নয়, জাতীয় ক্রীড়াঙ্গনের জন্যও এক অপূরণীয় ক্ষতি। কারণ, দেশের ক্রীড়া প্রতিভার মূল উৎস এই জেলা ও উপজেলা পর্যায়গুলোতেই নিহিত।

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে জেলাভিত্তিক একাডেমিগুলোর ভূমিকা অপরিসীম হলেও, এদের অধিকাংশই প্রয়োজনীয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের অভাবে ধুঁকছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সরকার ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে যে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল, তার আওতায় প্রতিটি জেলায় একটি করে মাল্টি-স্পোর্টস কমপ্লেক্স নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু World Bank-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২৩ সাল পর্যন্ত এই প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৩০ শতাংশ। এর ফলে, ফুটবল, ক্রিকেট, সাঁতার, অ্যাথলেটিক্সের মতো মৌলিক খেলাধুলায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য যে ন্যূনতম অবকাঠামো প্রয়োজন, তা অনেক জেলাতেই অনুপস্থিত। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, প্রশিক্ষক এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতার অভাবে অনেক একাডেমিই নিজেদের কার্যক্রম সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছে, যা তরুণ প্রতিভাদের জন্য এক বড় বাধা। এই পরিস্থিতি জেলা পর্যায় থেকে জাতীয় দলে খেলোয়াড় সরবরাহের ধারাবাহিকতাকে ব্যাহত করছে এবং দেশের ক্রীড়া মানকে পিছিয়ে দিচ্ছে।

অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সমন্বয়ের অভাবও জেলাভিত্তিক ক্রীড়া একাডেমিগুলোর উন্নয়নে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলো যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়-এর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে পারছে না অথবা প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহে ব্যর্থ হচ্ছে। ADB (Asian Development Bank)-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর জন্য বরাদ্দকৃত বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতেই খরচ হয়ে যায়, যার ফলে নতুন প্রতিভা অন্বেষণ বা উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য খুব কম অর্থই অবশিষ্ট থাকে। এছাড়া, প্রশিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতির প্রয়োগে ঘাটতিও একটি বড় সমস্যা। অনেক জেলায় মানসম্মত প্রশিক্ষকের অভাব দেখা যায়, যারা আধুনিক ক্রীড়া বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত নন। ফলে, খেলোয়াড়রা সঠিক দিকনির্দেশনা ও উচ্চমানের প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে।

খাত ২০১৮-১৯ অর্থবছর (কোটি টাকা) ২০২৩-২৪ অর্থবছর (কোটি টাকা) পরিবর্তনের হার (%)
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় (উন্নয়ন বাজেট) ১,৫০০ ২,২০০ ৪৬.৬৭%
জেলা ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প ১০০ ১৫০ ৫০.০০%
ক্রীড়া প্রশিক্ষণ ও প্রতিভা অন্বেষণ ৫০ ৭৫ ৫০.০০%
আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষক নিয়োগ ৫ ১০ ১০০.০০%

উৎস: বাংলাদেশ সরকার, অর্থ মন্ত্রণালয় ও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়-এর বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০২৩-২৪

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়-কে দ্রুত 'জেলা ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা' বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে প্রতিটি জেলায় আধুনিক মাল্টি-স্পোর্টস কমপ্লেক্স নির্মাণ এবং বিদ্যমান স্টেডিয়ামগুলোর সংস্কার কাজ ২০২৩ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা (যেমন, পরবর্তী তিন অর্থবছর) বেঁধে দিতে হবে। এর জন্য World Bank ও ADB-এর সঙ্গে যৌথ অর্থায়নে প্রকল্প গ্রহণ এবং নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করা আবশ্যক।
  • বাংলাদেশ সরকার-এর পক্ষ থেকে 'জাতীয় ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণ ও বিকাশ নীতিমালা, ২০২৪' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে জেলা ও উপজেলা পর্যায় থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের চিহ্নিতকরণ, দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষাবৃত্তি প্রদানের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা থাকবে। এই নীতিমালায় স্থানীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা প্রদানের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে এবং প্রতি বছর কমপক্ষে ৫০০ জন নতুন প্রতিভাবান খেলোয়াড়কে জাতীয় একাডেমিতে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়-কে একটি 'ক্রীড়া প্রশিক্ষক দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি' চালু করতে হবে, যা প্রতি বছর কমপক্ষে ১০০ জন জেলা পর্যায়ের প্রশিক্ষককে আধুনিক ক্রীড়া বিজ্ঞান, পুষ্টি এবং মনোবিজ্ঞান বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেবে। এর জন্য বিকেএসপি (বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) এবং বিদেশি ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব স্থাপন করে প্রশিক্ষকদের সনদপ্রাপ্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যা তাদের কর্মজীবনে পদোন্নতি এবং উন্নত বেতন কাঠামো নিশ্চিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ঘরোয়া স্পোর্টস অবকাঠামো ও একাডেমি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator