ভারত-মালদ্বীপ টানাপোড়েন: বেইজিংয়ের ছায়ায় আঞ্চলিক ক্ষমতার নতুন সমীকরণ | আই নিউজ বিডি

ভারত-মালদ্বীপ টানাপোড়েন: বেইজিংয়ের ছায়ায় আঞ্চলিক ক্ষমতার নতুন সমীকরণ

শাহেদ করিম  avatar   
শাহেদ করিম
ভারত-মালদ্বীপ টানাপোড়েন: বেইজিংয়ের ছায়ায় আঞ্চলিক ক্ষমতার নতুন সমীকরণ
ভারত-মালদ্বীপ টানাপোড়েন: বেইজিংয়ের ছায়ায় আঞ্চলিক ক্ষমতার নতুন সমীকরণ
ছবি: সংগৃহীত
ভারত ও মালদ্বীপের মধ্যে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুধু দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্র...

ভারত ও মালদ্বীপের মধ্যে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুধু দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নতুন ক্ষমতার সমীকরণকে উন্মোচন করেছে। মালদ্বীপের নতুন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জুর বেইজিং সফর এবং 'ইন্ডিয়া আউট' নীতির ওপর তার জোর, যা পূর্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রোটোকল ভেঙে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে ভারতের পরিবর্তে চীনের দিকে ঝুঁকেছে, তা দিল্লির জন্য এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ঘটনা ভারতের 'প্রতিবেশী প্রথমে' নীতির জন্য যেমন একটি চ্যালেঞ্জ, তেমনি বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের এক স্পষ্ট ইঙ্গিত। ঐতিহ্যগতভাবে ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত একটি দেশ যখন কৌশলগতভাবে চীনের দিকে ঝুঁকছে, তখন এটি কেবল মালদ্বীপের অভ্যন্তরীণ নীতি পরিবর্তন নয়, বরং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে।

এই টানাপোড়েনের মূলে রয়েছে মালদ্বীপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ভারতের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন। প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু তার নির্বাচনী প্রচারণায় ভারতীয় সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যা তিনি ক্ষমতায় আসার পর কার্যকর করার চেষ্টা করছেন। মালদ্বীপের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভারত বর্তমানে দুটি ধ্রুব হেলিকপ্টার এবং একটি ডর্নিয়ার বিমান পরিচালনার জন্য প্রায় ৭০-৮০ জন সামরিক সদস্য মালদ্বীপে মোতায়েন রেখেছে, যা মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত হয়। এই সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহারের দাবি মালদ্বীপের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধার আবেদন হিসেবে উপস্থাপিত হলেও, এর পেছনে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তারের এক সুস্পষ্ট ভূ-রাজনৈতিক কৌশল কাজ করছে। চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI)-এর অধীনে মালদ্বীপে বড় আকারের অবকাঠামো প্রকল্প, যেমন- মালে-হুলহুমালহ সেতু এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণে বেইজিংয়ের বিনিয়োগ, মালদ্বীপকে অর্থনৈতিকভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে। এই নির্ভরশীলতা মালদ্বীপকে চীনের ভূ-রাজনৈতিক ছায়াতলে টেনে আনছে, যা ভারত মহাসাগরে ভারতের কৌশলগত প্রভাবকে দুর্বল করার চীনা প্রচেষ্টার অংশ। এর ফলে, এক সময় সার্ক কাঠামোর আওতায় আঞ্চলিক সংহতিতে বিশ্বাসী মালদ্বীপ এখন বৃহত্তর ভারত মহাসাগরের শক্তি সমীকরণে একটি নতুন অক্ষ তৈরি করছে, যা দিল্লির জন্য এক গুরুতর চ্যালেঞ্জ।

এই আঞ্চলিক ক্ষমতার সমীকরণ পরিবর্তনের প্রভাব কেবল ভারত-মালদ্বীপ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য আঞ্চলিক জোট এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করছে। ভারত যখন BIMSTEC (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চাইছে, তখন মালদ্বীপের এই অবস্থান ভারতের আঞ্চলিক নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। BIMSTEC, যা সার্কের দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে ভারতের জন্য একটি কার্যকর আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, সেখানে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সংহতি ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। অন্যদিকে, মালদ্বীপের এই পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন UN Peacekeeping মিশনে তাদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে কিনা তা দেখার বিষয়। যদিও মালদ্বীপ UN Peacekeeping-এ তুলনামূলকভাবে ছোট অবদান রাখে, তবে আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে তাদের এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক ফোরামে তাদের অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী এই ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, যেখানে ভারতের ঐতিহ্যবাহী প্রভাব হ্রাস পেলে চীন একটি বিকল্প ক্ষমতা কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য ভিন্ন এক প্রেক্ষাপট তৈরি করবে।

দেশ মোট বৈদেশিক ঋণ (২০২২) চীনের কাছে ঋণের পরিমাণ (২০২২) চীনের কাছে ঋণের শতাংশ ভারতের কাছে ঋণের পরিমাণ (২০২২) ভারতের কাছে ঋণের শতাংশ
মালদ্বীপ ৬.২ বিলিয়ন ডলার ১.৫ বিলিয়ন ডলার ২৪.২% ০.৪ বিলিয়ন ডলার ৬.৪%
শ্রীলঙ্কা ৫৩.৫ বিলিয়ন ডলার ৭.১ বিলিয়ন ডলার ১৩.৩% ১.০ বিলিয়ন ডলার ১.৯%
পাকিস্তান ১২৬.৯ বিলিয়ন ডলার ৩০.০ বিলিয়ন ডলার ২৩.৬% ০.০ বিলিয়ন ডলার ০.০%
বাংলাদেশ ৯৬.৬ বিলিয়ন ডলার ৯.৮ বিলিয়ন ডলার ১০.১% ২.০ বিলিয়ন ডলার ২.১%

উৎস: বিশ্বব্যাংক, এশিয়া ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সংগৃহীত উপাত্তের ভিত্তিতে।

সুপারিশ

  • ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে 'প্রতিবেশী প্রথমে' নীতির অধীনে মালদ্বীপের সঙ্গে উচ্চ-পর্যায়ের কূটনৈতিক সংলাপ পুনরায় শুরু করতে হবে, যেখানে পারস্পরিক সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রতি সম্মান জানিয়ে নতুন একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কাঠামো (যেমন - ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন - IORA এর অধীনে) প্রস্তাব করা যেতে পারে, যা মালদ্বীপের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংবেদনশীলতাকে বিবেচনায় রাখবে।
  • BIMSTEC প্ল্যাটফর্মকে আরও শক্তিশালী করতে ভারত, বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কার মতো সদস্য দেশগুলোকে নিয়ে একটি যৌথ সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও দুর্যোগ প্রতিক্রিয়া মহড়া (যেমন - HADR অনুশীলন) আয়োজন করতে হবে, যা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিপরীতে একটি বিকল্প আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।
  • দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) এর কার্যকারিতা পুনরুজ্জীবিত করতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, যেখানে বিশেষ করে মালদ্বীপের মতো ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং বাণিজ্য সুবিধা (যেমন - SAFTA-এর অধীনে শুল্ক হ্রাস) প্রদান করে আঞ্চলিক নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে তারা একক কোনো পরাশক্তির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল না হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাহেদ করিম

শাহেদ করিম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

کوئی تبصرہ نہیں ملا


News Card Generator