শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য: মেধাহীনতার ফাঁদে শিক্ষাব্যবস্থা.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য: মেধাহীনতার ফাঁদে শিক্ষাব্যবস্থা..

মহিউদ্দিন নবী  avatar   
মহিউদ্দিন নবী
শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য: মেধাহীনতার ফাঁদে শিক্ষাব্যবস্থা..
শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য: মেধাহীনতার ফাঁদে শিক্ষাব্যবস্থা..
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের শিক্ষা খাত, যা জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার মূল ভিত্তি, সাম্প্রতিক সময়ে গভীর অনিয়ম ও দুর্নীতির জালে আটকা পড়েছে। বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং এ.....

বাংলাদেশের শিক্ষা খাত, যা জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার মূল ভিত্তি, সাম্প্রতিক সময়ে গভীর অনিয়ম ও দুর্নীতির জালে আটকা পড়েছে। বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং এমপিওভুক্তির মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও পরিচালনা কমিটির যোগসাজশে দুর্নীতির এক নতুন অধ্যায় উন্মোচিত হচ্ছে, যা মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে অর্থ আর ক্ষমতার দাপটকেই প্রতিষ্ঠিত করছে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) থেকে সরিয়ে আবারও ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আলোচনায় এসেছে। গত ১০ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সভায় এনটিআরসিএকে কেবল শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ ও প্রত্যয়নের দায়িত্বে সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়, যা শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জোরালো কণ্ঠস্বর উঠেছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ন্যাপ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্রশিবিরের মতো বিভিন্ন সংগঠন ও রাজনৈতিক দল এই পদক্ষেপকে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নতুন সুযোগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. এ এন এম এহসানুল হক মিলন যদিও ১১ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে ৭৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগে কোনো দুর্নীতির সুযোগ নেই বলে দাবি করেছেন এবং যোগ্যতার ভিত্তিতেই নিয়োগ হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন, তবে অতীতে তার নিজেরই একটি ভাইরাল ভিডিওতে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে নিয়োগে দুর্নীতির কথা স্বীকার করা হয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে এবং শিক্ষাব্যবস্থায় অযোগ্যদের অনুপ্রবেশ ঘটবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমনকি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতাও পরিচালনা কমিটির হাতে ফিরে আসায় অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের পুরোনো অভিযোগগুলো আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।

দুর্নীতির এই চিত্র কেবল নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনায়ও এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) কর্তৃক প্রকাশিত মার্চ ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ ছয় মাসে (১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর) ৯৭৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৯০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়েছে। এর মধ্যে জাল বা ভুয়া সনদ ব্যবহার, অবৈধ নিয়োগ, অর্থ আত্মসাৎ এবং সরকারি জমি বেহাত করার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) শিক্ষা খাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। আগস্ট ২০২৬-এ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) সাবেক উপাচার্যসহ পাঁচজনকে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তলব করা হয়েছে। এর আগে জুলাই ২০২৬-এ ভাঙ্গুড়ার একটি ঘটনায় শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের কারণে সাতটি নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করা হয় এবং ১.২৫ কোটি টাকার বেশি ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরেও আগস্ট ২০২৪-এ একটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়েছে, যেখানে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এছাড়াও, দিনাজপুর ও হবিগঞ্জের মতো বিভিন্ন স্থানে প্রধান শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে কর্মচারী নিয়োগ এবং প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে, যার তদন্তে সত্যতাও মিলেছে। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডেও সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ এসএসসি পরীক্ষার ফল জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে দুদকের অভিযান পরিচালিত হয়েছে।।

এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রেও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ২০২১ সালের এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তির জন্য ৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত 'হাদিয়া' বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ দিতে হয়। নিয়োগ, বদলি, পাঠদানের অনুমতিসহ অন্যান্য সেবার জন্য এই অর্থের পরিমাণ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং এর অধীন বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রধান শিক্ষকরা জড়িত থাকেন। অথচ, দেশে প্রায় ৮০ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষকের পদ শূন্য পড়ে আছে, অন্যদিকে ১ লাখেরও বেশি এনটিআরসিএ নিবন্ধিত প্রার্থী বেকার রয়েছেন, যাদের অনেকেই আইনি জটিলতা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বয়সের সীমা অতিক্রম করছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) বদলি ও পদোন্নতিতে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগেও অভিযান চালিয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে ২৬৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্পে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর কার্যালয়েও দুদকের অভিযান পরিচালিত হয়েছে, যেখানে দলীয় বিবেচনায় এনজিও নিয়োগের মতো অভিযোগ উঠেছে।।

শিক্ষাক্ষেত্রে এই লাগামহীন দুর্নীতি দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন, আর অযোগ্য ও অনৈতিক উপায়ে নিয়োগপ্রাপ্তরা শিক্ষার মানকে নিম্নগামী করছেন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা সঠিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং জাতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে। যখন শিক্ষামন্ত্রী ৭৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির সুযোগ নেই বলে দাবি করছেন, ঠিক তখনই বিভিন্ন মহল থেকে ম্যানেজিং কমিটির হাতে নিয়োগ ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আন্দোলন হচ্ছে, যা এই খাতে দুর্নীতির ব্যাপকতার ইঙ্গিত বহন করে। এই পরিস্থিতিতে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং মেধাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

সুপারিশ: শিক্ষাক্ষেত্রে চলমান দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে অবিলম্বে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত: প্রথমত, বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করে এনটিআরসিএ-এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী ও ত্রুটিমুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) প্রতিবেদনে চিহ্নিত সকল আর্থিক অনিয়ম, জাল সনদ এবং অবৈধ নিয়োগের ঘটনায় দ্রুত ও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে সকল প্রকার আর্থিক লেনদেন বন্ধে একটি অনলাইনভিত্তিক স্বচ্ছ প্রক্রিয়া চালু করতে হবে এবং দুর্নীতির সাথে জড়িত সকল স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। চতুর্থত, এনটিআরসিএ কর্তৃক নিবন্ধিত বেকার শিক্ষকদের দ্রুত নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা দূর করতে আইনি জটিলতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পঞ্চমত, দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) শিক্ষা খাতে তাদের অভিযান আরও জোরদার করতে হবে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও পরিচালনা কমিটির সদস্যদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: মহিউদ্দিন নবী

মহিউদ্দিন নবী, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক নিয়োগ ও এমপিও বাণিজ্য।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator