অলিম্পিক অ্যাথলেটিক্সে বাংলাদেশের পদক স্বপ্ন: বিজ্ঞানসম্মত প্রশিক্ষণ ও আর্থিক বিনিয়োগের অভাব? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অলিম্পিক অ্যাথলেটিক্সে বাংলাদেশের পদক স্বপ্ন: বিজ্ঞানসম্মত প্রশিক্ষণ ও আর্থিক বিনিয়োগের অভাব?

রায়হান রশীদ  avatar   
রায়হান রশীদ
অলিম্পিক অ্যাথলেটিক্সে বাংলাদেশের পদক স্বপ্ন: বিজ্ঞানসম্মত প্রশিক্ষণ ও আর্থিক বিনিয়োগের অভাব?
অলিম্পিক অ্যাথলেটিক্সে বাংলাদেশের পদক স্বপ্ন: বিজ্ঞানসম্মত প্রশিক্ষণ ও আর্থিক বিনিয়োগের অভাব?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি ফ্রান্সের প্যারিসে সমাপ্ত অলিম্পিক গেমসের ২১তম আসরে বাংলাদেশের অ্যাথলেটিক্স দলের অংশগ্রহণ আবারও দেশের ক্রীড়া মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যদিও ব...

সম্প্রতি ফ্রান্সের প্যারিসে সমাপ্ত অলিম্পিক গেমসের ২১তম আসরে বাংলাদেশের অ্যাথলেটিক্স দলের অংশগ্রহণ আবারও দেশের ক্রীড়া মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যদিও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী অ্যাথলেটরা নিজেদের ব্যক্তিগত সেরা পারফরম্যান্স প্রদর্শনের চেষ্টা করেছেন, তবে পদকের দৌড়ে তারা ছিলেন যোজন যোজন পিছিয়ে। এই ফলাফল নতুন নয়; স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ অলিম্পিকের কোনো ইভেন্টেই পদক জিততে পারেনি, বিশেষত অ্যাথলেটিক্সে। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোও সীমিত সম্পদ নিয়ে অলিম্পিক পদক জয়ের নজির স্থাপন করেছে। এটি কেবল একটি খেলার ব্যর্থতা নয়, বরং দেশের ক্রীড়া অবকাঠামো, নীতি নির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের অভাবের এক সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশের ক্রীড়া ব্যবস্থাপনায় বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণের অভাব একটি প্রকট সমস্যা হিসেবে বহু বছর ধরে চিহ্নিত হয়ে আসছে। দেশের ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশন, এখনও আন্তর্জাতিক মানের কোচিং স্টাফ, স্পোর্টস সায়েন্টিস্ট, নিউট্রিশনিস্ট এবং সাইকোলজিস্টদের সমন্বিত দল গঠনে ব্যর্থ। উদাহরণস্বরূপ, ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিক্স (World Athletics) কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক প্রশিক্ষণ মডিউল এবং বায়োমেকানিক্যাল অ্যানালাইসিস সরঞ্জামাদি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেকটাই পিছিয়ে। যেখানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অ্যাথলেটিক্স প্রোগ্রামগুলো পারফরম্যান্স মনিটরিং, ইনজুরি প্রিভেনশন এবং রিকভারির জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, সেখানে বাংলাদেশের অ্যাথলেটরা মূলত সনাতন পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল। এর ফলে, অ্যাথলেটদের শারীরিক সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না, এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার তীব্রতার সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অর্থাৎ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, এই ঘাটতি পূরণে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং বিশেষজ্ঞ নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা দেখাচ্ছে, যা অ্যাথলেটিক্সের মৌলিক ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।

আর্থিক বিনিয়োগের অপ্রতুলতা এবং এর অদক্ষ ব্যবহার বাংলাদেশের অলিম্পিক স্বপ্ন পূরণের পথে আরেকটি বড় অন্তরায়। বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর ক্রীড়া খাতে বাজেট বরাদ্দ করলেও, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অবকাঠামো নির্মাণ বা প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতেই খরচ হয়ে যায়। তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান অ্যাথলেট খুঁজে বের করা, তাদের দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন করা হয় না। বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্রীড়া খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করলেও, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেই বিনিয়োগের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। উদাহরণস্বরূপ, 'ন্যাশনাল স্পোর্টস পলিসি ২০১০' অনুযায়ী, ক্রীড়া উন্নয়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করার কথা বলা হলেও, বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। ফলে, অ্যাথলেটদের জন্য উচ্চমানের আবাসিক প্রশিক্ষণ সুবিধা, অত্যাধুনিক সরঞ্জাম ক্রয় এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত রয়ে গেছে। এই সীমাবদ্ধতাগুলো সরাসরি অ্যাথলেটদের পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং তাদের আন্তর্জাতিক মান অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে।

বিবরণ ২০১৮-১৯ অর্থবছর ২০১৯-২০ অর্থবছর ২০২০-২১ অর্থবছর ২০২১-২২ অর্থবছর ২০২২-২৩ অর্থবছর
ক্রীড়া খাতে মোট বাজেট বরাদ্দ (কোটি টাকা) ৪২০ ৫০০ ৫৫০ ৬৫০ ৭২০
অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের জন্য বরাদ্দ (কোটি টাকা) ২.৫ ৩.০ ৩.২ ৩.৫ ৪.০
মোট ক্রীড়া বাজেটের অ্যাথলেটিক্স অনুপাত (%) ০.৬% ০.৬% ০.৫৮% ০.৫৪% ০.৫৫%
আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ/প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ব্যয় (কোটি টাকা) ০.৮ ১.০ ১.০ ১.২ ১.৫

উৎস: বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয়, বার্ষিক বাজেট প্রতিবেদন ও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি 'ন্যাশনাল স্পোর্টস সায়েন্স ইনস্টিটিউট' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিক্স-এর গাইডলাইন মেনে অ্যাথলেটদের বায়োমেকানিক্যাল অ্যানালাইসিস, নিউট্রিশন প্ল্যানিং এবং সাইকোলজিক্যাল সাপোর্ট প্রদান করবে। এই ইনস্টিটিউটটি বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-এর সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করবে এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বিজ্ঞানীদের সাথে অংশীদারিত্ব স্থাপন করবে।
  • বাংলাদেশ সরকার এবং অর্থ মন্ত্রণালয়কে 'ন্যাশনাল স্পোর্টস পলিসি ২০১০'-এর আলোকে অ্যাথলেটিক্সের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে আগামী ১০ বছরের জন্য তৃণমূল পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক মানের অ্যাথলেট তৈরির জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে। এই পরিকল্পনায় ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং এডিবি-এর টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রামগুলোর সাথে সমন্বয় করে বিদেশী বিনিয়োগ এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ (যেমন: কর্পোরেট স্পন্সরশিপ) আকর্ষণ করার জন্য বিশেষ প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
  • বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনকে (বিএএফ) ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিক্স-এর 'এলিট অ্যাথলেট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম'-এর সাথে সংযুক্ত হয়ে তাদের মানদণ্ড অনুযায়ী প্রশিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ শিবির আয়োজন এবং অ্যাথলেটদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। এই উদ্যোগের জন্য বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) এর সাথে যৌথভাবে একটি 'অলিম্পিক টার্গেট ২০৩২' রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, যেখানে প্রতিটি অ্যাথলেটের জন্য ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স লক্ষ্যমাত্রা এবং প্রয়োজনীয় সম্পদ নির্ধারণ করা থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রায়হান রশীদ

রায়হান রশীদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: অলিম্পিক ও আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

לא נמצאו הערות


News Card Generator