সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ই-কমার্স খাতের দ্রুত প্রসার একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য। তবে, বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS)-এর প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে: উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেলেও, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় তাদের ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের হার এখনও প্রত্যাশিত মাত্রার চেয়ে পিছিয়ে। এই পিছিয়ে পড়ার প্রবণতা নারী উদ্যোক্তাদের ই-কমার্স যাত্রায় এক অদৃশ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে ব্যাহত করছে। প্রতিবেদনটি আরও বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, শহরাঞ্চলে সীমিত পরিসরে কিছু ডিজিটাল প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নারীদের কাছে পৌঁছালেও, গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের নারী উদ্যোক্তারা আধুনিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে নিজেদের পণ্য ও সেবা নিয়ে আসতে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল সাক্ষরতা ও কারিগরি দক্ষতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই বিভাজন শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত জ্ঞান বা ইন্টারনেট ব্যবহারের পার্থক্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সামগ্রিক ইকোসিস্টেমের অভাবকে নির্দেশ করে, যেখানে তারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সফলভাবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারছেন না।
এই অদৃশ্য বিভাজন শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর অভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর গভীরতা আরও সুদূরপ্রসারী এবং কাঠামোগত। BANBEIS-এর তথ্য অনুযায়ী, যদিও মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রীদের ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং বা অন্যান্য বৃত্তিমূলক আইসিটি কোর্সগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ এখনও তুলনামূলকভাবে কম। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড অনুমোদিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে নারীর হার ছিল প্রায় ২৮%, যা ই-কমার্স বা অনলাইন উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ও ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে সফল হতে হলে কেবল সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহার জানলেই চলে না; বরং পণ্য তালিকাভুক্তি (product listing), ডিজিটাল চিত্র প্রক্রিয়াকরণ (digital image processing), সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিপণন কৌশল (social media marketing strategies), গ্রাহক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা (customer relationship management), এবং ডেটা অ্যানালিটিক্স (data analytics) এর মতো সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল দক্ষতা অপরিহার্য। কারিগরি শিক্ষায় নারীর এই কম অংশগ্রহণ সরাসরি তাদের এই বিশেষায়িত দক্ষতা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে, তারা ই-কমার্স জগতের অপার সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং তাদের উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে। এই তথ্য প্রমাণ করে যে, সাধারণ শিক্ষায় নারীর অগ্রগতি হলেও, ডিজিটাল অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষায় তাদের প্রবেশাধিকার ও সংশ্লিষ্ট দক্ষতা অর্জন এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যা ডিজিটাল বিভাজনকে আরও প্রকট করে তুলছে।
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং শিল্প দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প (SEIP)-এর অধীনে বিভিন্ন সময় দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম হাতে নেওয়া হলেও, সেগুলোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনেক সময় ই-কমার্স কেন্দ্রিক সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল দক্ষতা যেমন- অনলাইন বিপণন, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিদ্যমান প্রশিক্ষণ কর্মসূচীগুলো প্রায়শই সাধারণ কম্পিউটার জ্ঞান বা অফিস অ্যাপ্লিকেশন শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যা একজন সফল ই-কমার্স উদ্যোক্তার জন্য যথেষ্ট নয়। উদাহরণস্বরূপ, SEIP-এর কিছু উদ্যোগে ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নের প্রচেষ্টা থাকলেও, সেগুলোর পরিধি এবং নারীদের জন্য বিশেষায়িত সুযোগের অভাব লক্ষণীয়। অনেক ক্ষেত্রে, প্রশিক্ষণ উপকরণ বা প্রশিক্ষক নির্বাচন এমনভাবে করা হয় না যা নারীদের নির্দিষ্ট চাহিদা বা শেখার পদ্ধতিকে সমর্থন করে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC)-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ই-কমার্স উদ্যোক্তা তৈরির উপযোগী বিশেষায়িত ডিজিটাল দক্ষতা কোর্স বা মডিউলের অভাব স্পষ্ট। অনেক ক্ষেত্রে, বিদ্যমান কোর্সগুলো তাত্ত্বিক জ্ঞানসর্বস্ব হওয়ায় বাস্তবসম্মত ই-কমার্স পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায়োগিক দক্ষতা অর্জনে তা যথেষ্ট নয়। ফলস্বরূপ, গ্রাজুয়েট নারী শিক্ষার্থীরাও উদ্যোক্তা হিসেবে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে কার্যকরভাবে প্রবেশ করতে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছেন, কারণ তাদের হাতে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল টুলস ও কৌশল ব্যবহারের জ্ঞান নেই। এই প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ই-কমার্স খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের পথে একটি সুদৃঢ় অদৃশ্য বাধা তৈরি করেছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নারী ক্ষমতায়নের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ডিজিটাল বিভাজনের এই অদৃশ্য প্রাচীর শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক বা কারিগরি সীমাবদ্ধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর সাথে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অনেক গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার নারী উদ্যোক্তাদের জন্য, এমনকি যদি ডিজিটাল প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকেও, পরিবারিক দায়বদ্ধতা, যেমন - সন্তান লালন-পালন বা গৃহস্থালীর কাজ, যাতায়াতের সীমাবদ্ধতা, এবং সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে সেই সুযোগ গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর জন্য ঘরের বাইরে গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা বা দীর্ঘ সময় অনলাইনে কাজ করা অনেক সময় গ্রহণযোগ্য হয় না। পারিবারিক সমর্থন ও অনুপ্রেরণার অভাব, এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগের মতো বিষয়গুলিও নারীদের ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনে নিরুৎসাহিত করে। অনেক নারী মনে করেন, অনলাইনে তাদের ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার হতে পারে বা তারা হয়রানির শিকার হতে পারেন, যা তাদের ই-কমার্স কার্যক্রমে অংশগ্রহণে একটি মানসিক বাধা তৈরি করে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর বা NSDA-এর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো অনেক সময় দূরবর্তী হওয়ায় নারীদের জন্য সেখানে নিয়মিত যাতায়াত করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ করে যদি পরিবহন ব্যবস্থা সহজলভ্য না হয় বা নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকে। এছাড়া, ডিজিটাল ডিভাইস ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাতিত্বও দেখা যায়, যেখানে পুরুষদের ডিভাইস ব্যবহারের অগ্রাধিকার দেওয়া হয় বা নারীদের ইন্টারনেট ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এই সকল সামাজিক প্রতিবন্ধকতা নারীদের জন্য ডিজিটাল শিক্ষা এবং দক্ষতা অর্জনের পথকে আরও দুর্গম করে তোলে, যা তাদের ই-কমার্স যাত্রাকে কার্যত অদৃশ্য বাধা দ্বারা বেষ্টিত করে এবং তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের স্বপ্নকে ম্লান করে দেয়।
| সূচক | ২০২১-২২ সাল (নারী) | ২০২১-২২ সাল (পুরুষ) | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে ICT কোর্সে ভর্তি | ১৫,৪৫০ জন | ৫৪,৮০০ জন | মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ২২% নারী |
| NSDA অনুমোদিত ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ | ৮,৭২০ জন | ১৯,৩০০ জন | ই-কমার্স উপযোগী দক্ষতা অর্জনে লিঙ্গবৈষম্য |
| UGC অধিভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ICT/CSE বিভাগে ভর্তি | ৩৩,১০০ জন | ৭২,৬৫০ জন | উচ্চশিক্ষায় প্রযুক্তিগত বিষয়ে নারীর কম অংশগ্রহণ |
| SEIP প্রকল্পের আওতায় ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত নারী | ১২,৫০০ জন | ন/প্র | নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম |
উৎস: বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS), কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং শিল্প দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প (SEIP) এর বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত উপাত্তের ভিত্তিতে প্রাক্কলিত।
সুপারিশ
- জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে যৌথভাবে 'ই-কমার্স নারী উদ্যোক্তা দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালা' প্রণয়ন করতে হবে। এই নীতিমালায় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল মার্কেটিং, অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম, এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষায়িত মডিউল বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং সকল কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ন্যূনতম ৩০% আসন সংরক্ষিত রাখতে হবে, যা 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি ২০১৩' এর আলোকে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
- বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC)-কে দেশের সকল পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE) এবং ব্যবসায় প্রশাসন (BBA) অনুষদে 'ই-কমার্স ও ডিজিটাল উদ্যোক্তা' বিষয়ক বিশেষায়িত ডিপ্লোমা/সার্টিফিকেট কোর্স চালু করার নির্দেশনা দিতে হবে। এই কোর্সগুলোর কারিকুলামে ব্যবহারিক জ্ঞান ও বাস্তব কেস স্টাডির উপর জোর দিতে হবে এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য সহজলভ্য করতে বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে, যা 'উচ্চশিক্ষা কৌশলপত্র ২০১০' এর লক্ষ্যমাত্রার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে।
- শিল্প দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প (SEIP) এবং বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) এর সমন্বয়ে 'গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ডিজিটাল সাক্ষরতা ও ই-কমার্স প্রশিক্ষণ কর্মসূচি' চালু করতে হবে। এই কর্মসূচিতে মোবাইল ভ্যান বা কমিউনিটি ভিত্তিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ব্যবহার করে তৃণমূল পর্যায়ে নারীদের কাছে পৌঁছাতে হবে এবং প্রশিক্ষণ শেষে সফল উদ্যোক্তাদের জন্য প্রাথমিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সেটআপে কারিগরি সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। এই উদ্যোগকে 'জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০'-এর অন্তর্ভুক্ত ডিজিটাল শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যের সাথে যুক্ত করা যেতে পারে।