মাটির প্রাণ ফেরাতে দেশীয় বীজ ও অর্গানিক সার: পুষ্টির মানদণ্ডে নতুন দিগন্ত | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মাটির প্রাণ ফেরাতে দেশীয় বীজ ও অর্গানিক সার: পুষ্টির মানদণ্ডে নতুন দিগন্ত

সুমাইয়া পারভীন  avatar   
সুমাইয়া পারভীন
মাটির প্রাণ ফেরাতে দেশীয় বীজ ও অর্গানিক সার: পুষ্টির মানদণ্ডে নতুন দিগন্ত
মাটির প্রাণ ফেরাতে দেশীয় বীজ ও অর্গানিক সার: পুষ্টির মানদণ্ডে নতুন দিগন্ত
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) যৌথভাবে দেশের ৬৪টি জেলায় 'জৈব সার উৎপাদন ও ব্...

সম্প্রতি, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) যৌথভাবে দেশের ৬৪টি জেলায় 'জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহার সম্প্রসারণ' শীর্ষক একটি পাইলট প্রকল্প শুরু করেছে, যার লক্ষ্য ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের মোট আবাদি জমির অন্তত ১৫% অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষের আওতায় আনা। এই উদ্যোগটি শুধু মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্যই নয়, বরং দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের উপর নির্ভরতা কমাতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কৃষকদের মাঝে দেশীয় বীজের ব্যবহার ও জৈব সারের উৎপাদন পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এই প্রকল্পের অন্যতম মূল স্তম্ভ, যা দীর্ঘমেয়াদী টেকসই কৃষি ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ ফলনশীল (HYV) জাতের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা একদিকে যেমন খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়েছে, তেমনি অন্যদিকে মাটির উর্বরতা হ্রাস এবং মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ঘাটতির মতো গভীর সমস্যা তৈরি করেছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকে দেশের প্রধান শস্য উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমেছে, যা মাটির জল ধারণ ক্ষমতা এবং পুষ্টি উপাদান সরবরাহের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে। এর ফলে, উৎপাদিত ফসলের পুষ্টিমানও প্রভাবিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, BRRI কর্তৃক প্রকাশিত 'রাইস জার্নাল'-এর এক গবেষণা পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আধুনিক জাতের ধানের কিছু ক্ষেত্রে প্রথাগত দেশীয় জাতের তুলনায় জিঙ্ক ও আয়রনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদানের পরিমাণ কম পাওয়া যাচ্ছে। দেশীয় বীজ, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্থানীয় পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিয়েছে, সেগুলো কেবল প্রতিকূল আবহাওয়া সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না, বরং মাটির জৈব বৈচিত্র্য বজায় রাখতেও সহায়ক। এই বীজগুলো রাসায়নিক সারের উপর কম নির্ভরশীল এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বেশি, যা কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমাতেও সাহায্য করে। তাছাড়া, অর্গানিক সার, বিশেষ করে ভার্মিকম্পোস্ট ও কম্পোস্ট, মাটির অণুজীবের কার্যকলাপ বাড়িয়ে মাটির কাঠামো উন্নত করে এবং গাছের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান ধীরে ধীরে সরবরাহ করে, যা রাসায়নিক সারের আকস্মিক পুষ্টি সরবরাহের চেয়ে অনেক বেশি টেকসই।

পুষ্টির মানদণ্ডে অর্গানিক কৃষির প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বেশ কিছু গবেষণা পরিচালিত হয়েছে এবং ফলাফলগুলো অর্গানিক পণ্যের পক্ষে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) কর্তৃক প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে উৎপাদিত অর্গানিক সবজি ও ফলের মধ্যে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন সি এবং নির্দিষ্ট কিছু খনিজ উপাদানের পরিমাণ প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদিত পণ্যের তুলনায় বেশি। এই উচ্চ পুষ্টিমান সরাসরি জনস্বাস্থ্যের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে অপুষ্টিজনিত সমস্যা মোকাবেলায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ও সম্প্রতি 'জাতীয় জৈব কৃষি নীতি ২০২৩' এর খসড়া প্রকাশ করেছে, যেখানে অর্গানিক কৃষিকে উৎসাহিত করার জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা এবং সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়ন দেশের কৃষকদের অর্গানিক কৃষির দিকে ধাবিত করবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অর্গানিক পণ্যের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশীয় বীজ ও অর্গানিক সারের সমন্বিত ব্যবহার একটি কার্যকর কৌশল হতে পারে, যা কেবল মাটির স্বাস্থ্যই নয়, মানুষের স্বাস্থ্যেরও উন্নতি ঘটাবে এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করবে।

সূচক ২০১০ সাল ২০২০ সাল ২০২৩ সাল (প্রাক্কলিত)
মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ (গড় %)* ২.২% ১.৮% ১.৬%
রাসায়নিক সারের ব্যবহার (কেজি/হেক্টর) ২২০ ২৫৫ ২৭০
জৈব সার ব্যবহারকারী কৃষক (% মোট কৃষক) ১.৫% ৩.০% ৪.৫%
অর্গানিক পদ্ধতিতে আবাদি জমি (% মোট আবাদি জমি) ০.৫% ১.২% ২.৫%

উৎস: বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) সমীক্ষা প্রতিবেদন, ২০২৩। *মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ (গড়) সমগ্র দেশের আবাদি জমির গড়।

সুপারিশ

  • কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক যৌথভাবে 'জাতীয় জৈব কৃষি নীতি ২০২৩' এর দ্রুত চূড়ান্তকরণ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, যেখানে অর্গানিক সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং কৃষকদের জন্য সরাসরি আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-কে দেশীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ, গবেষণা এবং উন্নয়নে আরও বেশি বাজেট বরাদ্দ প্রদান করা, যাতে পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ ও স্থানীয় আবহাওয়ায় সহনশীল নতুন জাত উদ্ভাবন করা যায় এবং DAE এর মাধ্যমে কৃষকদের কাছে এই বীজ সহজলভ্য করা হয়।
  • কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এর তত্ত্বাবধানে ইউনিয়ন পর্যায়ে মডেল অর্গানিক সার উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করা এবং কৃষকদের বিনামূল্যে বা স্বল্প মূল্যে জৈব সার উৎপাদন পদ্ধতি ও এর উপকারিতা সম্পর্কে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সুমাইয়া পারভীন

সুমাইয়া পারভীন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator