সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের প্রায় ৪২ শতাংশ তাদের দৈনন্দিন জীবনে ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে ঘুমের সংকটে ভুগছে। এই সমীক্ষায় ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এবং উঠে এসেছে যে, রাতে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও কম্পিউটারের দীর্ঘক্ষণ ব্যবহার তাদের সার্কাডিয়ান রিদমকে ব্যাহত করছে, যা ফলস্বরূপ ক্রনিক অনিদ্রা এবং দিনের বেলায় ক্লান্তি সৃষ্টি করছে। এই প্রবণতা কেবল মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরই নয়, বরং শারীরিক ফিটনেসের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ কর্মশক্তি এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ডিজিটাল আসক্তি এবং ঘুমের অভাবের এই চ্যালেঞ্জটি কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি ব্যাপক সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলছে। World Bank-এর 'Bangladesh Development Update 2023' শীর্ষক প্রতিবেদনে পরোক্ষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তরুণ প্রজন্মের কর্মক্ষমতা হ্রাসের পেছনে স্বাস্থ্যগত কারণগুলো, বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্য এবং ঘুমের ঘাটতি, অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, উৎপাদনশীলতা হ্রাসের ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রায় ১.৫ শতাংশের মতো নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে যদি এই সমস্যা দ্রুত সমাধান করা না হয়। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম মস্তিষ্কের মেলাটোনিন উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করে, যা প্রাকৃতিক ঘুম চক্রের জন্য অপরিহার্য। এর ফলে তরুণরা কেবল রাতে ঘুমাতে সমস্যা অনুভব করে না, বরং সকালে ঘুম থেকে উঠতে এবং দিনের বেলায় মনোনিবেশ করতেও ব্যর্থ হয়, যা তাদের শিক্ষাজীবন এবং কর্মজীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিতি বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষেত্রে পারফরম্যান্সের নিম্নগতি এই সমস্যারই সুস্পষ্ট লক্ষণ।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের 'Asian Development Outlook 2024' প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে তরুণদের স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ নিয়ে একটি বিশেষ অধ্যায় প্রকাশ করেছে। সেখানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ডিজিটাল ডিভাইসের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং স্থূলতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত, তরুণদের মধ্যে ফাস্ট ফুড এবং চিনিযুক্ত পানীয়ের প্রতি আসক্তি বাড়ছে, যা ডিজিটাল আসক্তির সাথে হাত ধরাধরি করে চলছে। দীর্ঘক্ষণ বসে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা এবং শারীরিক কার্যকলাপের অভাবের কারণে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বেড়ে চলেছে। এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন দেখছে, তা বাস্তবায়নের জন্য একটি সুস্থ ও কর্মঠ তরুণ প্রজন্ম অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান ধারায়, তরুণদের স্বাস্থ্যঝুঁকি দেশের ভবিষ্যৎ জনশক্তির সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে চাপ সৃষ্টি করবে এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করবে।
| বিষয় | ২০১৯ সাল | ২০২৩ সাল | পরিবর্তন হার |
|---|---|---|---|
| ১৮-৩০ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল আসক্তির প্রবণতা | ২৫% | ৪৩% | +১৮% |
| ডিজিটাল ডিভাইসের কারণে ঘুমের সংকটে ভোগা তরুণের সংখ্যা (আনুমানিক) | ৩০ লাখ | ৬২ লাখ | +৩২ লাখ |
| দৈনিক ৬ ঘণ্টার কম ঘুমানো তরুণের শতাংশ | ৩৫% | ৫২% | +১৭% |
| শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে স্থূলতার হার (১৮-৩০ বছর) | ১২% | ২১% | +৯% |
উৎস: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ জনস্বাস্থ্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (২০২৩)
সুপারিশ
- শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে যৌথভাবে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে 'ডিজিটাল ওয়েলবিইং' পাঠ্যক্রম বাধ্যতামূলক করতে হবে, যেখানে ডিজিটাল ডিভাইসের সঠিক ব্যবহার, স্ক্রিন টাইমের ব্যবস্থাপনা এবং ঘুমের স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা হবে।
- স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে জাতীয় পর্যায়ে একটি ব্যাপক 'ঘুম ও সুস্থতা' প্রচারাভিযান শুরু করতে হবে, যা বাংলাদেশ সরকারের বার্ষিক জনস্বাস্থ্য বাজেট থেকে অর্থায়ন পাবে এবং প্রচারণায় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
- বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে একত্রিত হয়ে তরুণদের জন্য রাতে নির্দিষ্ট সময়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলিতে প্রবেশাধিকার সীমিত করার জন্য প্রযুক্তিগত সমাধান বা নীতিগত দিকনির্দেশনা প্রণয়ন করতে হবে, যেমন রাতের বেলায় নির্দিষ্ট কিছু অ্যাপের ব্যবহার সীমিতকরণ বা 'নাইট মোড' বাধ্যতামূলক করা।