বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতিতে 'ফ্রেন্ডশরিং'-এর নতুন মেরুকরণ: বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতিতে 'ফ্রেন্ডশরিং'-এর নতুন মেরুকরণ: বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

সালাহউদ্দিন আহমেদ  avatar   
সালাহউদ্দিন আহমেদ
বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতিতে 'ফ্রেন্ডশরিং'-এর নতুন মেরুকরণ: বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ
বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতিতে 'ফ্রেন্ডশরিং'-এর নতুন মেরুকরণ: বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের সুস্পষ্ট ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে, যেখানে 'ফ্রেন্ডশরিং' নামক একটি নতুন ধারণা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ...

সম্প্রতি, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের সুস্পষ্ট ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে, যেখানে 'ফ্রেন্ডশরিং' নামক একটি নতুন ধারণা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতিকে প্রভাবিত করছে। ২০২২ সালের এপ্রিলে তৎকালীন মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি জ্যানেট ইয়েলেন এক বক্তৃতায় প্রথম এই ধারণাটি জনপ্রিয় করেন, যেখানে তিনি সমমনা ও বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে সরবরাহ শৃঙ্খলকে কেন্দ্রীভূত করার আহ্বান জানান। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভূ-রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল ও সুরক্ষিত করা। এই নীতি এখন কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নেই; ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাপানসহ অনেক উন্নত অর্থনীতির দেশ তাদের সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্গঠনে 'ফ্রেন্ডশরিং' কৌশলকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এর ফলে, একসময়কার 'বিশ্বগ্রাম' ধারণা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এবং নতুন করে আঞ্চলিক বা ভূ-রাজনৈতিক জোটের ভিত্তিতে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রবণতা বাড়ছে, যা বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য নতুন সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ উভয়ই নিয়ে আসছে।

এই 'ফ্রেন্ডশরিং' প্রবণতা মূলত চীন-নির্ভরতা কমানোর একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, বিশেষত কোভিড-১৯ মহামারীকালে সরবরাহ শৃঙ্খলে সৃষ্ট বিঘ্ন এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এর পালে নতুন হাওয়া দিয়েছে। উন্নত দেশগুলো এখন কেবল ব্যয় কমানোর দিকে মনোযোগ না দিয়ে, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতা (resilience) এবং নির্ভরযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর ফলস্বরূপ, তারা এমন দেশগুলোকে বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে বেছে নিতে আগ্রহী হচ্ছে যাদের সাথে তাদের অভিন্ন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এবং তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশ, তার কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, ক্রমবর্ধমান শ্রমশক্তি এবং স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে এই নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি সম্ভাব্য 'ফ্রেন্ডশরিং' গন্তব্য হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। বিশেষত, তৈরি পোশাক, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং চামড়াজাত পণ্যের মতো শিল্পগুলো পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য বিকল্প সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তবে, 'ফ্রেন্ডশরিং'-এর এই নতুন মেরুকরণ বাংলাদেশের জন্য উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে। বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্লকগুলো যখন তাদের নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করবে, তখন নিরপেক্ষ বা জোট-নিরপেক্ষ দেশগুলোর জন্য নতুন বাজার খুঁজে পাওয়া বা বিদ্যমান বাজারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলো তাদের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বেশিরভাগ সমমনা দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে, তাহলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো তাদের প্রচলিত রপ্তানি বাজার হারাতে পারে অথবা নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হতে পারে। উপরন্তু, 'ফ্রেন্ডশরিং' নীতির কারণে প্রযুক্তি হস্তান্তর, শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং উন্নয়ন সহায়তার ক্ষেত্রে ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। এই পরিস্থিতিতে, আঞ্চলিক জোট যেমন BIMSTEC-এর মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদার করা এবং বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

সূচক ২০১৯ ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩ (প্রাক্কলিত)
যুক্তরাষ্ট্রের চীন থেকে আমদানি (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ৪৫১.৭ ৪৩৫.০ ৫০৫.৫ ৫৩৬.৮ ৪২৭.২
যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ থেকে আমদানি (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ৬.৮ ৫.৯ ৮.১ ১০.০ ৯.৭
ইউরোপীয় ইউনিয়নের চীন থেকে আমদানি (বিলিয়ন ইউরো) ৪১২.৯ ৩৮৩.৪ ৪৭৪.১ ৬২৪.৭ ৫৬১.৪
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশ থেকে আমদানি (বিলিয়ন ইউরো) ১৭.৩ ১৫.২ ১৯.৭ ২৭.৭ ২৬.৫
বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি (বার্ষিক %) ১০.৫ -১৭.১ ১৪.৬ ৩৫.৪ ৬.৭

উৎস: মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ, ইউরোস্ট্যাট, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (বাংলাদেশ)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে 'ফ্রেন্ডশরিং' প্রবণতা নিরীক্ষণের জন্য একটি বিশেষ সেল গঠন করতে হবে, যা প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে নীতিগত পরিবর্তন এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রবাহের গতিপথ বিশ্লেষণ করে দ্রুত নীতিগত সুপারিশ প্রদান করবে। এর মাধ্যমে, দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে নতুন বাজার এবং বিনিয়োগের সুযোগ অন্বেষণ করা সহজ হবে।
  • সরকারকে রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে 'জাতীয় রপ্তানি নীতি'তে (National Export Policy) জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার আনতে হবে, যেখানে উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগের জন্য বিশেষ প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে এবং 'ফ্রেন্ডশরিং' নীতির আওতায় উন্নত প্রযুক্তির সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব বাড়াতে সাহায্য করবে।
  • BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকা পালন করা উচিত, বিশেষত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি সহজীকরণ, শুল্ক হ্রাস এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা জোরদার করার মাধ্যমে। এটি আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করবে এবং বৈশ্বিক 'ফ্রেন্ডশরিং' প্রবণতার মুখে বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাজারকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সালাহউদ্দিন আহমেদ

সালাহউদ্দিন আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলা কূটনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

לא נמצאו הערות


News Card Generator