বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও… | আই নিউজ বিডি

বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

ড. তৌফিক এলাহী  avatar   
ড. তৌফিক এলাহী
বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়ার প্রাথমিক তথ্য এবং একই সময়ে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর 'গভর্নেন্স ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়ার প্রাথমিক তথ্য এবং একই সময়ে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর 'গভর্নেন্স ইন্ডিকেটরস' (WGI) রিপোর্টে বাংলাদেশের 'রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সহিংসতা অনুপস্থিতি' এবং 'সরকারের কার্যকারিতা' সূচকে সামান্য অবনতি, দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া, জনগণের আস্থা এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক স্বচ্ছতার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে উত্থাপিত অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগ, যা কিনা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা জনমনে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি করছে কিনা, তা গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বরাবরই একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে, কিন্তু এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এবং জনমনে তার প্রভাব, বিশেষ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় বিভিন্ন মত প্রকাশের স্বাধীনতার সীমা নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক, এই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থা অর্জনে প্রযুক্তির ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হলেও, এর প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক কম নয়। যেমন, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের মতানৈক্য রয়েছে। নির্বাচন কমিশন ইভিএম-এর কারিগরি সক্ষমতা এবং নির্ভুলতা নিয়ে বারবার আশ্বস্ত করলেও, ব্যালট পেপারভিত্তিক নির্বাচনের ঐতিহ্য এবং ইভিএম-এর সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার সুরক্ষা নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নগুলো জনমনে সন্দেহ তৈরি করেছে। ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে সীমিত পরিসরে ইভিএম ব্যবহার এবং পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এর ব্যাপক প্রয়োগ, উভয় ক্ষেত্রেই কারিগরি ত্রুটি বা তথাকথিত 'ম্যানিপুলেশন'-এর অভিযোগগুলো জন আস্থা অর্জনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। এটি কেবল প্রযুক্তিগত দুর্বলতা নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি সামগ্রিক আস্থার অভাবের একটি প্রতিফলন। উদাহরণস্বরূপ, ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তিতে বিলম্ব বা ত্রুটি, প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের অনিশ্চয়তা এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে প্রশ্ন, রাজনৈতিক স্বচ্ছতার অভাবকে আরও প্রকট করে তোলে। এই বিষয়গুলো বাংলাদেশ সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবতার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ব্যবধান তৈরি করে, যা গণতন্ত্রের মৌলিক স্তম্ভগুলোকে দুর্বল করে দিতে পারে।

রাজনৈতিক স্বচ্ছতার অভাবে জনগণের আস্থা হারানোর বিষয়টি কেবল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা সুশাসন এবং জবাবদিহিতার অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রসারিত হয়। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসেস রিফর্মস (ASR) এবং পাবলিক ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট (PFM) সংস্কারে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এডিবি-এর সহায়তায় বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও, সেগুলোর বাস্তবায়ন এবং ফলাফল জনসম্মুখে কতটা স্পষ্ট, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশেষ করে, নির্বাচনী ব্যয়, রাজনৈতিক দলগুলোর তহবিল সংগ্রহ এবং ব্যয়ের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশের বিষয়টি প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনগুলো অনেক সময়ই অসম্পূর্ণ বা দেরিতে প্রকাশিত হয়, যা তথ্যের অবাধ প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে। এছাড়া, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন এবং প্রার্থীর যোগ্যতা নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের অভাবও রাজনৈতিক স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই ধরনের পরিস্থিতি কেবল ভোটারদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে না, বরং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বৈধতা এবং তাদের প্রতি জন আস্থাকে ক্ষুণ্ন করে, যা একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে আরও সক্রিয় ও উদ্ভাবনী ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।

সূচক ২০১৯ ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩ (প্রাক্কলিত)
ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গভর্নেন্স ইন্ডিকেটরস: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সহিংসতা অনুপস্থিতি (PVS) স্কোর (-2.5 থেকে 2.5) -0.56 -0.62 -0.65 -0.70 -0.72
ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গভর্নেন্স ইন্ডিকেটরস: সরকারের কার্যকারিতা (GE) স্কোর (-2.5 থেকে 2.5) -0.34 -0.38 -0.41 -0.45 -0.47
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত মোট নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা (কোটি) ১০.৪২ ১০.৯৯ ১১.২৪ ১১.৯১ ১২.১৪
ADB এর 'পার্টনারশিপ কান্ট্রি স্ট্র্যাটেজি' (PCS) এর আওতায় সুশাসন খাতে বরাদ্দ (মিলিয়ন USD) ১৫০ ১৭৫ ২০০ ২২০ ২৫০

উৎস: World Bank Governance Indicators (WGI), বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি), Asian Development Bank (ADB) Country Operations Business Plan (COBP)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) 'নির্বাচনী আইন' (Representation of the People Order, RPO) এর ধারা ৩৩ এবং ৩৪ এর অধীনে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ব্যয় ও তহবিল সংগ্রহের সকল তথ্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে (যেমন, নির্বাচনের ৯০ দিন আগে এবং নির্বাচনের ৬০ দিন পরে) তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং এই তথ্যগুলো নিয়মিত নিরীক্ষার জন্য 'মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক' (CAG) এর কার্যালয়ের কাছে জমা দিতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে 'তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯' (Right to Information Act, 2009) এর পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত সকল তথ্য (যেমন, ইভিএম-এর কারিগরি প্রতিবেদন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়া, অভিযোগ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া) জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ও সহজে প্রবেশযোগ্য করতে হবে।
  • ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এডিবি-এর 'সুশাসন ও জনসেবা উন্নয়ন সহায়তা প্রকল্প' (Governance and Public Service Development Support Project) এর আওতায়, 'জাতীয় সংসদ সচিবালয়' এবং 'আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়'কে শক্তিশালী করতে হবে যাতে নির্বাচনী আইন সংস্কার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে আইনগত কাঠামো আরও কার্যকর হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. তৌফিক এলাহী

ড. তৌফিক এলাহী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator