স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির বিষবৃক্ষ: কেনাকাটা থেকে অব্যবস্থাপনা | আই নিউজ বিডি

স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির বিষবৃক্ষ: কেনাকাটা থেকে অব্যবস্থাপনা

রেহনুমা তাবাসসুম  avatar   
রেহনুমা তাবাসসুম
স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির বিষবৃক্ষ: কেনাকাটা থেকে অব্যবস্থাপনা
স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির বিষবৃক্ষ: কেনাকাটা থেকে অব্যবস্থাপনা
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। বিপুল বাজেট বরাদ্দ সত্ত্বেও, এই খাত...

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। বিপুল বাজেট বরাদ্দ সত্ত্বেও, এই খাতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা অনিয়ম সাধারণ মানুষের মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকারকে প্রতিনিয়ত ব্যাহত করছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন নিজেও স্বীকার করেছেন যে, 'বিগত অপশাসনের কারণে দেশের স্বাস্থ্য খাত দুর্নীতিতে নিমজ্জিত' এবং জনগণের অর্থসম্পদ লুটপাট ও অপচয় হয়েছে। তার এই মন্তব্য স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা বলা হলেও, মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন প্রশ্নবিদ্ধই রয়ে গেছে।

বিশেষ করে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় অনিয়ম এখন এই খাতের এক পরিচিত চিত্র। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০১৯ সালেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১১টি খাতে দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে ২৫ দফা সুপারিশ করেছিল, যার মধ্যে ক্রয়, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, চিকিৎসা সেবা, সরঞ্জাম ব্যবহার এবং ওষুধ সরবরাহ অন্যতম। কোভিড-১৯ মহামারি এই দুর্নীতির মহোৎসবকে আরও প্রকট করে তোলে। মাস্ক, পিপিই, স্যানিটাইজার, আইসিইউ সরঞ্জাম, ভেন্টিলেটর, পিসিআর মেশিন ও টেস্ট কিট সংগ্রহে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। দুদক মার্চ ২০২৬-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কোভিড-১৯ জরুরি প্রতিক্রিয়া প্রকল্পের কেনাকাটায় ১২ কোটি ৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা লুটপাটের প্রমাণ পেয়েছে এবং সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকসহ ৩৮ জন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এনে ১৩ জনের বিরুদ্ধে ৬টি পৃথক মামলার সুপারিশ করেছে। এর আগে, ২০২২ সালের একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, কুয়েত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল প্রতিটি ইসিজি মেশিন ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকায় কিনেছিল, যেখানে বাজারমূল্য ছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। মুগদা জেনারেল হাসপাতালও ১ লাখ ৯৯ হাজার টাকার ভিডিও ল্যারিঙ্গোস্কোপ কিনেছিল ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকায়। ২০২৩ সালের এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে কোভিডকালে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে সরঞ্জাম ও সেবা কেনাকাটায় ২৯ কোটি ৯৩ লাখেরও বেশি টাকার আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে আসে, যা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) লঙ্ঘনের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়েও এই চিত্র বদলায়নি। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজে কম্পিউটার ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বরে যন্ত্রপাতি সরবরাহ সম্পূর্ণ না হলেও বিল পরিশোধ করা হয় এবং নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে। একইভাবে, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালে ওষুধ কেনাকাটায় বিশাল অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। ১০১ টাকা বাজারমূল্যের পেন্টোথাল সোডিয়াম ইনজেকশন ১ হাজার ২৯৯ টাকায় ক্রয় দেখানো হয়েছে, যা ২৪ কোটি টাকার ওষুধ ক্রয় কেলেঙ্কারির ইঙ্গিত দেয়। সরকারি কর্মচারী হাসপাতালেও হাইটেক মেডিকেল সরঞ্জাম কেনাকাটায় নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে পিপিআর লঙ্ঘন করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। এই অনিয়মের পেছনে প্রায়শই শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করে, যারা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। স্বাস্থ্য খাতের কথিত 'মাফিয়া' মোতাজ্জেরুল ইসলাম ওরফে মিঠু, যিনি বিদেশ থেকে পুরো খাত নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তিনি ডিসেম্বর ২০২৫-এ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের একটি মামলায় জামিন পেয়েছেন, যা এই সিন্ডিকেটগুলোর ক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়।

শুধু কেনাকাটাই নয়, অব্যবস্থাপনাও স্বাস্থ্য খাতের একটি বড় সমস্যা। পরিকল্পনা ছাড়াই ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি কেনা হয়, যা চালানোর জন্য দক্ষ জনবল থাকে না, ফলে সেগুলো বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন নিজেই জুলাই ২০২৬-এ এই সমস্যার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, 'পরিকল্পনার অভাবে অনেক দামি চিকিৎসা যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে আছে'। এর ফলে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের অপচয় হয়, অন্যদিকে রোগীরা প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অপসারণের দাবিতে চিকিৎসকরাও আগস্ট ২০২৪-এ আন্দোলন করেছেন, যেখানে অবৈধ নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নের অভিযোগ ছিল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) অক্টোবর ২০২৩-এ তাদের এক প্রতিবেদনে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকেও দুর্নীতির আখড়া হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেখানে নকল ওষুধের বিস্তার এবং ঘুষ ছাড়া ফাইল না নড়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান তলানিতে পৌঁছেছে এবং সাধারণ মানুষকে চিকিৎসার জন্য নিজের পকেট থেকে প্রায় ৭৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ এবং প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিচ্ছে।

স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দ প্রতি বছর বাড়লেও, এর কার্যকর বাস্তবায়ন খুবই হতাশাজনক। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা জিডিপির ১.০১ শতাংশ এবং গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। কিন্তু এই বিপুল বরাদ্দের সদ্ব্যবহার হচ্ছে না। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে উন্নয়ন প্রকল্পের মাত্র ৩.৭১ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে, 'ইঞ্জিনিয়ারের কাজ ডাক্তার দিয়ে করালে তো এমন হবেই'। অর্থাৎ, সম্পদের অদক্ষ ব্যবহার, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং কাঠামোগত বিচ্ছিন্নতা এই খাতের উন্নয়নে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি জনমনে গভীর হতাশা তৈরি করেছে এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থাহীনতা বাড়াচ্ছে।

সুপারিশ: স্বাস্থ্য খাতের এই গভীর সংকট নিরসনে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী 'স্বাস্থ্য খাত পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহি কমিশন' গঠন করা জরুরি। এই কমিশনকে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটার প্রতিটি ধাপ, নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি এবং প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত করার ক্ষমতা দিতে হবে। কমিশনের অধীনে একটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সিন্ডিকেট আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে না পারে। একই সাথে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) কঠোরভাবে অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে এবং ই-টেন্ডারিং প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে, যেখানে তৃতীয় পক্ষের স্বাধীন নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। অব্যবহৃত যন্ত্রপাতি সচল করতে দক্ষ জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা এবং স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করাও অপরিহার্য। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে 'জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল' গঠন এবং জনগণের 'আউট-অফ-পকেট' ব্যয় কমানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

📎 এই প্রতিবেদনের তথ্যপ্রমাণ

গুগল সার্চের মাধ্যমে এই প্রতিবেদনের গবেষণায় ব্যবহৃত প্রকৃত সোর্স:


🔎 অনুসন্ধানে: রেহনুমা তাবাসসুম

রেহনুমা তাবাসসুম, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: স্বাস্থ্য খাত, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটা।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator