পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব: সম্ভাবনার আড়ালে দুর্নীতির অন্ধকার | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব: সম্ভাবনার আড়ালে দুর্নীতির অন্ধকার

তৌসিফ রহমান  avatar   
তৌসিফ রহমান
পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব: সম্ভাবনার আড়ালে দুর্নীতির অন্ধকার
পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব: সম্ভাবনার আড়ালে দুর্নীতির অন্ধকার
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাত অপার সম্ভাবনার আধার। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং বৈ...

বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাত অপার সম্ভাবনার আধার। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি দেশটিকে পর্যটকদের জন্য এক আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করেছে। তবে, এই বিশাল সম্ভাবনা সত্ত্বেও, খাতটি দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা এবং অনিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম, যা এই খাতের সামগ্রিক দুর্বলতাকে আরও প্রকট করে তোলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই খাত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা ও প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

পর্যটন খাতে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন (বিপিসি) এর হোটেল-মোটেলগুলো আকর্ষণীয় স্থানে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও ধারাবাহিকভাবে লোকসান গুনছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত গড়ে ১০ কোটি টাকা করে লোকসান হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটির। এর প্রধান কারণ হিসেবে আধুনিকতার অভাব, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাদারিত্বের ঘাটতি, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং আমলানির্ভরতাকে দায়ী করা হয়েছে। এমনকি কিছু স্থাপনা রাজনৈতিক বিবেচনায় তৈরি করা হয়েছে, যা পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে উপযুক্ত ছিল না। বেসরকারি খাতের ট্যুর অপারেটরদের মধ্যেও দক্ষতার অভাব এবং গ্রাহকদের সাথে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে, যা বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। পর্যটন স্পটগুলোতে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার অভাবও একটি বড় সমস্যা, যেখানে চুরি, খাদ্যে বিষক্রিয়া বা পরিবহন দুর্ঘটনার মতো নেতিবাচক অভিজ্ঞতা পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করে। উদাহরণস্বরূপ, সুন্দরবনগামী সড়কগুলোর বেহাল দশা পর্যটকদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। এছাড়া, হাতিয়া ও নিঝুম দ্বীপের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন প্রকল্পের বাস্তবায়ন অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে, যা মহাপরিকল্পনার অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং এর ফলে এই খাত দেশের জিডিপিতে প্রত্যাশিত অবদান রাখতে পারছে না। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের একজন কর্মকর্তাকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি ও আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গ্রেপ্তার করেছিল।

প্রত্নতত্ত্ব খাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর দেশের পুরাকীর্তি সংরক্ষণ ও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকলেও, তাদের কার্যক্রম মূলত খননকাজে সীমাবদ্ধ এবং গবেষণায় পিছিয়ে রয়েছে। সংরক্ষণে অব্যবস্থাপনা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো বেদখল হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। দেশের ৫১৭টি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি এবং ২২টি জাদুঘর এই অধিদপ্তরের আওতাধীন হলেও, লোকবলের অভাব এবং কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে অনেক মূল্যবান নিদর্শন ঝুঁকির মুখে রয়েছে। 'ট্রেজারস ট্রুভ অ্যাক্ট ১৮৭৮', 'অ্যানশিয়েন্ট মনুমেন্টস প্রিজারভেশন অ্যাক্ট ১৯০৪' এবং 'অ্যান্টিকুইটিজ অ্যাক্ট ১৯৪৭' এর মতো আইন থাকা সত্ত্বেও প্রত্নসম্পদ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতা দেখা যাচ্ছে। পুরোনো ঢাকায় হেরিটেজ তালিকাভুক্ত অনেক ভবন ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং সংস্কারের নামে ঐতিহ্য ধ্বংস করা হচ্ছে, যা জাতিগত পরিচয় ও নান্দনিকতাকে ক্ষুণ্ন করছে। এই অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে দেশের অমূল্য ইতিহাস ও ঐতিহ্য ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।

এই দুই খাতের সমস্যাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর কাঠামোগত দুর্বলতার অংশ। আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়হীনতা একটি প্রধান বাধা, যা পর্যটন খাতের উন্নয়নে বারবার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত সম্প্রতি 'জাতীয় পর্যটন নীতিমালা-২০২৬' প্রণয়নের কথা বলেছেন এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়হীনতা দূর করার জন্য সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে, শুধু নীতিমালা প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, এর কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। দক্ষ জনবলের অভাব, বিশেষ করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে, গবেষণার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং সংরক্ষণের কাজকে ব্যাহত করছে। এছাড়া, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে অভিযোগের পাহাড় জমছে, কিন্তু কমিশনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সামগ্রিকভাবে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো তাদের পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছে না, যা দেশের অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উভয়ের জন্যই এক বিশাল ক্ষতি।

সুপারিশ: বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাতের পুনরুজ্জীবন এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি সমন্বিত ও কঠোর কর্মপরিকল্পনা অপরিহার্য। প্রথমত, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে পর্যটন কর্পোরেশন ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সকল অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং দ্রুত তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়হীনতা দূর করতে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে, যা 'জাতীয় পর্যটন নীতিমালা-২০২৬' এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে এবং পর্যটন মহাপরিকল্পনার অধীনে থাকা প্রকল্পগুলোর দ্রুত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে। তৃতীয়ত, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের জনবল বৃদ্ধি, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত, যাতে তারা কেবল খননকাজেই নয়, বরং পুরাকীর্তি সংরক্ষণ ও গবেষণাতেও সমানভাবে গুরুত্ব দিতে পারে। চতুর্থত, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর অবৈধ দখলদারিত্ব উচ্ছেদ এবং ধ্বংস রোধে 'অ্যান্টিকুইটিজ অ্যাক্ট ১৯৪৭' সহ বিদ্যমান আইনগুলোর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে, তবে তাদের সেবার মান, স্বচ্ছতা এবং গ্রাহক সুরক্ষার বিষয়ে কঠোর তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো ধরনের প্রতারণা বা নিম্নমানের সেবা প্রদান না হয়। পরিশেষে, পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার মান উন্নত করতে হবে এবং পর্যটকদের জন্য একটি নিরাপদ ও আনন্দদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: তৌসিফ রহমান

তৌসিফ রহমান, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator