গ্লোবাল স্কলারশিপ: মেধা পাচার নাকি প্রবাসে বাংলাদেশের নতুন দূত? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গ্লোবাল স্কলারশিপ: মেধা পাচার নাকি প্রবাসে বাংলাদেশের নতুন দূত?

সাবরিনা চৌধুরী  avatar   
সাবরিনা চৌধুরী
গ্লোবাল স্কলারশিপ: মেধা পাচার নাকি প্রবাসে বাংলাদেশের নতুন দূত?
গ্লোবাল স্কলারশিপ: মেধা পাচার নাকি প্রবাসে বাংলাদেশের নতুন দূত?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমানো...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমানো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগের দশকের তুলনায় প্রায় ৩০% বেশি। বিশেষত বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা ও ব্যবসায় প্রশাসনে (STEM ও Business Administration) স্নাতকোত্তর ও ডক্টরাল প্রোগ্রামে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে। এই প্রবণতা দেশের উচ্চশিক্ষা খাতের জন্য এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে: এটি কি মেধা পাচারের নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ, নাকি প্রবাসে বাংলাদেশের নতুন দূত তৈরির এক অঘোষিত কৌশল?

এই ক্রমবর্ধমান বহির্গমন একদিকে যেমন দেশের অভ্যন্তরে উচ্চশিক্ষার মান, গবেষণা সুবিধা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগের অপ্রতুলতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে বিদেশের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা ও গবেষণা পরিবেশের প্রতি তরুণ প্রজন্মের সহজাত আকর্ষণকেও তুলে ধরছে। অনেক ক্ষেত্রে, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বৃত্তিমূলক সুযোগ-সুবিধা এবং উন্নত ল্যাবরেটরি সুবিধা দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় অনেক বেশি আকর্ষণীয়। এর ফলে, দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার জন্য বিদেশে চলে যেতে দ্বিধা করছেন না, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের গবেষণা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, দেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসি যখন উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে, তখন এই প্রবণতা তাদের প্রচেষ্টার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

তবে, এই প্রবণতার ইতিবাচক দিকটিও অনস্বীকার্য। যারা বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন, তাদের একটি অংশ পরবর্তীতে দেশে ফিরে এসে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাচ্ছেন। এমনকি যারা প্রবাসে স্থায়ী হচ্ছেন, তারাও রেমিট্যান্স পাঠানোর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। এছাড়া, তারা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন, যা দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সহায়ক। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে যৌথভাবে এমন কিছু বৃত্তিমূলক প্রোগ্রাম চালুর চেষ্টা করছে, যা শিক্ষার্থীদের শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষা নয়, আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জনেও সহায়তা করবে। এর মাধ্যমে প্রবাসীদের জ্ঞান ও দক্ষতা দেশের জন্য কীভাবে সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে নতুন করে নীতি প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

সাল বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোট স্কলারশিপ প্রাপ্তি (আনুমানিক) শীর্ষ ৫টি গন্তব্য দেশ (ক্রমবর্ধমান)
২০১৯ ৫৫,০০০ ১২,০০০ মালয়েশিয়া, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা
২০২০ ৪৫,০০০ (কোভিড-১৯ প্রভাব) ১০,০০০ মালয়েশিয়া, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া
২০২১ ৬০,০০০ ১৫,০০০ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি
২০২২ ৭৫,০০০ ১৮,০০০ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি
২০২৩ ৮৫,০০০ (প্রাক্কলিত) ২০,০০০ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি

উৎস: বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদন, UNESCO Institute for Statistics (UIS) ডেটা এবং BANBEIS শিক্ষা পরিসংখ্যান।

সুপারিশ

  • দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা বাজেট ও অবকাঠামো উন্নয়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে একটি সুনির্দিষ্ট পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (যেমন: "শিক্ষা গবেষণা ও উদ্ভাবন ২০৩০" পরিকল্পনা) প্রণয়ন করতে হবে। ইউজিসি-এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ল্যাব, জার্নাল অ্যাক্সেস এবং গবেষণা ফেলোশিপ প্রদানে বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে হবে, যাতে দেশেই উচ্চতর গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-কে যৌথভাবে একটি "প্রবাস ফেরত মেধাবী দক্ষতা সনাক্তকরণ ও কর্মসংস্থান কর্মসূচি" (Diaspora Talent Integration Program) চালু করতে হবে, যা বিদেশে অর্জিত দক্ষতা ও ডিগ্রিকে দেশীয় শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী সনদ প্রদান এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে সহায়তা করবে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA)-এর সাথে সমন্বয় করে প্রবাস ফেরত মেধাবীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে।
  • BANBEIS-এর মাধ্যমে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের একটি বিস্তারিত ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে, যেখানে তাদের অধ্যয়নের ক্ষেত্র, প্রাপ্ত স্কলারশিপের ধরন এবং সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা উল্লেখ থাকবে। এই ডাটাবেজ ব্যবহার করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে "গ্লোবাল স্কলার কানেকশন প্ল্যাটফর্ম" তৈরি করতে হবে, যা প্রবাসীদের সাথে দেশের শিক্ষাবিদ ও শিল্প বিশেষজ্ঞদের নেটওয়ার্কিং এবং জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ করে দেবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাবরিনা চৌধুরী

সাবরিনা চৌধুরী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator