ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সম্প্রতি তাদের 'জেনারালাইজড সিস্টেম অফ প্রেফারেন্সেস' (GSP) স্কিমের আওতায় নতুন বাণিজ্য কৌশল ঘোষণা করেছে, যা ২০২৭ সাল থেকে কার্যকর হবে। এই নতুন কাঠামো, বিশেষ করে GSP+ স্কিম, বাংলাদেশের জন্য স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে উত্তরণের পর এক নতুন চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে, বাংলাদেশ ইইউ বাজারে 'এভরিথিং বাট আর্মস' (EBA) সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার ভোগ করছে, যা ২০২৯ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু এরপর GSP+ স্কিমের কঠোর শর্তাবলী পূরণ করা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য হবে, যার মধ্যে মানবাধিকার, শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সুশাসনের মতো ২৭টি আন্তর্জাতিক কনভেনশন পরিপালন অন্যতম। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই উত্তরণকালীন পরিস্থিতি এবং ইইউ-এর সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করছে, কারণ এই বাণিজ্য সুবিধা বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের একটি বিশাল অংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
ইইউ-এর এই নতুন বাণিজ্য কৌশল বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি অন্যদিকে বেশ কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জও উপস্থাপন করেছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ EBA সুবিধা হারাবে এবং GSP+ সুবিধার জন্য আবেদন করতে হবে। GSP+ সুবিধার মূল শর্ত হলো উল্লিখিত ২৭টি আন্তর্জাতিক কনভেনশনের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। এর মধ্যে রয়েছে আইএলও কনভেনশন, মানবাধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং পরিবেশ সুরক্ষার প্রটোকল। বাংলাদেশের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো শ্রম অধিকারের ক্ষেত্রে অগ্রগতি প্রদর্শন করা, বিশেষ করে শ্রমিকদের সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং যৌথ দর কষাকষির অধিকার নিশ্চিত করা। পাশাপাশি, সুশাসন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণও ইইউ-এর মূল বিবেচনার বিষয়। এই শর্তাবলী পূরণে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাবে, যা দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশের জন্য এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। BIMSTEC (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) এবং সার্ক (সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশন)-এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলোতে সক্রিয় অংশগ্রহণ বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতিকে শক্তিশালী করতে পারে, যা ইইউ-এর সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে একটি সম্মিলিত অবস্থান তৈরি করতে সহায়ক হবে। বিশেষ করে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ সুরক্ষায় আঞ্চলিক সহযোগিতা ইইউ-এর পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে (UN Peacekeeping) বাংলাদেশের ধারাবাহিক এবং উল্লেখযোগ্য অবদান দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নত করেছে, যা ইইউ-এর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে সহায়ক হতে পারে। তবে, এই ভাবমূর্তিকে GSP+ সুবিধার জন্য প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ সংস্কারের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে, বিশেষ করে শ্রম আইন এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে।
| সূচক | ২০২৩ সালের তথ্য | ইইউ-এর শর্তাবলী পূরণে প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| ইইউ-তে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি | ৩০.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার | EBA সুবিধার ওপর নির্ভরতা এবং GSP+ এর প্রয়োজনীয়তা |
| LDC থেকে উত্তরণের তারিখ (আনুমানিক) | ২০২৬ | EBA সুবিধা হারানোর সময়সীমা |
| GSP+ সুবিধার জন্য প্রয়োজনীয় কনভেনশন | ২৭টি (মানবাধিকার, শ্রম, পরিবেশ, সুশাসন) | অভ্যন্তরীণ আইন ও নীতি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা |
| শ্রমিক অধিকার সংক্রান্ত আইএলও কনভেনশন (৮৭ ও ৯৮) | পূর্ণ বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান | ইইউ-এর GSP+ মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ দিক |
উৎস: বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন
সুপারিশ
- শ্রম আইন (২০১৫) এবং শ্রম বিধিমালা (২০১৫) এর দ্রুত সংশোধন করে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (ILO)-এর কনভেনশন ৮৭ (সংগঠন করার স্বাধীনতা) এবং ৯৮ (যৌথ দর কষাকষি) এর সাথে সম্পূর্ণরূপে সঙ্গতিপূর্ণ করা এবং এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে শ্রম মন্ত্রণালয়কে শক্তিশালী করা।
- মানবাধিকার কমিশনকে (জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৭ অনুযায়ী গঠিত) আরও স্বাধীন ও শক্তিশালী করা এবং এর সুপারিশমালা বাস্তবায়নে সরকার কর্তৃক দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ নিশ্চিত করা, যা ইইউ-এর মানবাধিকার সংক্রান্ত মানদণ্ড পূরণে সহায়ক হবে।
- পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (১৯৯৫) এবং এর বিধিমালাসমূহের (যেমন: পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭) কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং নবায়নযোগ্য শক্তি ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জাতীয় কৌশলপত্র (যেমন: বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান) বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যা ইইউ-এর পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে সহায়ক হবে।