জাহাজ ভাঙা শিল্পের বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: গ্রিন শিপিংয়ের পথে বাধা কোথায়? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জাহাজ ভাঙা শিল্পের বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: গ্রিন শিপিংয়ের পথে বাধা কোথায়?

জাহাঙ্গীর আলম  avatar   
জাহাঙ্গীর আলম
জাহাজ ভাঙা শিল্পের বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: গ্রিন শিপিংয়ের পথে বাধা কোথায়?
জাহাজ ভাঙা শিল্পের বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: গ্রিন শিপিংয়ের পথে বাধা কোথায়?
ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে অবস্থিত জাহাজ ভাঙা শিল্পে গত এক দশকে সুরক্ষা ও পরিবেশগত মান উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টা...

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে অবস্থিত জাহাজ ভাঙা শিল্পে গত এক দশকে সুরক্ষা ও পরিবেশগত মান উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জগুলো গ্রিন শিপিংয়ের পথে এখনও বড় বাধা। সম্প্রতি, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে এখনও অ্যাসবেস্টস, পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইল (PCB) এবং ভারী ধাতুযুক্ত তৈলাক্ত বর্জ্যের নিরাপদ অপসারণে ঘাটতি রয়েছে। সমীক্ষাটি উল্লেখ করেছে, প্রায় ২০% ইয়ার্ডে বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই, যা পরিবেশ ও শ্রমিক স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি তৈরি করছে।

এই শিল্পের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ থাকলেও, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম জাহাজ ভাঙা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে অন্যতম, যা দেশের ইস্পাত শিল্পের কাঁচামালের প্রায় ৫০-৬০% সরবরাহ করে থাকে। তবে, এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি প্রায়শই পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি এবং শ্রমিকদের জীবন ঝুঁকির বিনিময়ে অর্জিত হয়। World Bank-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প প্রতি বছর প্রায় ৩০০,০০০ টন বিষাক্ত ও বিপজ্জনক বর্জ্য তৈরি করে, যার মধ্যে রয়েছে অ্যাসবেস্টস, সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম এবং অন্যান্য ভারী ধাতু। এই বর্জ্যগুলো সমুদ্রের পানি, মাটি এবং বায়ুতে মিশে গিয়ে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে, সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় এলাকার সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, যেমন ম্যানগ্রোভ বন এবং প্রবাল প্রাচীর, এই দূষণের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং কার্যকর বর্জ্য শোধন প্ল্যান্টের স্বল্পতা এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক ইয়ার্ডে বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং নিষ্ক্রিয়করণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব সুস্পষ্ট।

গ্রিন শিপিংয়ের বৈশ্বিক মানদণ্ড অর্জনের পথে বাংলাদেশের জন্য অন্যতম প্রধান বাধা হলো আন্তর্জাতিক কনভেনশনগুলোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। হংকং কনভেনশন (Hong Kong International Convention for the Safe and Environmentally Sound Recycling of Ships, 2009) এবং বাসেল কনভেনশন (Basel Convention on the Control of Transboundary Movements of Hazardous Wastes and Their Disposal) উভয়ই জাহাজ ভাঙা শিল্পের জন্য পরিবেশগত সুরক্ষা ও শ্রমিক নিরাপত্তার মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ সরকার হংকং কনভেনশন অনুমোদন করলেও, এর কার্যকর বাস্তবায়নে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে, "ইনভেনটরি অফ হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস" (IHM) বা বিপজ্জনক পদার্থের তালিকা প্রস্তুতকরণ এবং প্রতিটি জাহাজের জন্য এই তালিকা অনুযায়ী বর্জ্য অপসারণের প্রক্রিয়াটি এখনও সার্বজনীনভাবে অনুসরণ করা হয় না। এর ফলে, ইয়ার্ড মালিকরা প্রায়শই পুরাতন এবং ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজ আমদানি করে, যেখানে বিপজ্জনক পদার্থের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। ADB (Asian Development Bank)-এর এক সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙা শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ সুবিধা এবং প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব রয়েছে, যা গ্রিন শিপিংয়ের নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক। এছাড়া, এই শিল্পের জন্য একটি সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও একটি বড় সমস্যা।

বিবরণ ২০১০ ২০১৫ ২০২০ ২০২২
জাহাজ ভাঙা শিল্পের বার্ষিক বিষাক্ত বর্জ্য (টন) ২৫০,০০০ ২৮০,০০০ ৩০০,০০০ ৩২০,০০০
হংকং কনভেনশন অনুমোদিত দেশের সংখ্যা (বিশ্বব্যাপী) ৩ ১২ ১৭ ২৩
বাংলাদেশের ইয়ার্ডে বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা সম্পন্ন ইয়ার্ডের শতাংশ ৮% ১৩% ১৮% ২০%
ভারী ধাতু দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় এলাকার শতাংশ (সীতাকুণ্ড) ৫০% ৬০% ৭০% ৭৫%

উৎস: World Bank, ADB, ILO এবং বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত জাহাজ ভাঙা ও জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ বিধিমালা, ২০২২ (Ship Breaking and Ship Recycling Rules, 2022)-এর পূর্ণাঙ্গ ও কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষত, ইয়ার্ডগুলোর জন্য বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্ট স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে নিয়মিত ও কঠোর পরিদর্শনের মাধ্যমে এর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (যেমন, শিল্প মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়) এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা (যেমন, World Bank, ADB) এর যৌথ উদ্যোগে একটি 'গ্রিন শিপব্রেকিং ফান্ড' গঠন করতে হবে। এই ফান্ডের মাধ্যমে ইয়ার্ড মালিকদেরকে হংকং কনভেনশনের মানদণ্ড অনুযায়ী IHM (Inventory of Hazardous Materials) প্রস্তুতকরণ এবং নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো নির্মাণে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকারের সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরকে হংকং কনভেনশনের সকল শর্ত পূরণ সাপেক্ষে 'জাহাজ ভাঙার জন্য প্রস্তুত সনদ' (Ready for Recycling Certificate) প্রদানের প্রক্রিয়া কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (IMO) এর সাথে সমন্বয় করে বৈশ্বিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। যেসব জাহাজ IHM ছাড়া আসে, সেগুলোকে বর্জ্য অপসারণের জন্য প্রাথমিক প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে (Preliminary Processing Facility) পাঠিয়ে বিপজ্জনক পদার্থ অপসারণের পরই ইয়ার্ডে প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহাঙ্গীর আলম

জাহাঙ্গীর আলম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Geen reacties gevonden


News Card Generator