হাতির করিডোরে মানুষের বসতি: সংকটাপন্ন বন্যপ্রাণী ও উন্নয়নের দন্দ্ব | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

হাতির করিডোরে মানুষের বসতি: সংকটাপন্ন বন্যপ্রাণী ও উন্নয়নের দন্দ্ব

জাবীর হোসেন  avatar   
জাবীর হোসেন
হাতির করিডোরে মানুষের বসতি: সংকটাপন্ন বন্যপ্রাণী ও উন্নয়নের দন্দ্ব
হাতির করিডোরে মানুষের বসতি: সংকটাপন্ন বন্যপ্রাণী ও উন্নয়নের দন্দ্ব
ছবি: সংগৃহীত
কক্সবাজারের চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের অভ্যন্তরে সম্প্রতি অবৈধ বসতি স্থাপন এবং বনভূমি দখলের ঘটনা পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগকে ...

কক্সবাজারের চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের অভ্যন্তরে সম্প্রতি অবৈধ বসতি স্থাপন এবং বনভূমি দখলের ঘটনা পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। এই অভয়ারণ্যটি একসময় এশীয় হাতির গুরুত্বপূর্ণ বিচরণক্ষেত্র এবং করিডোর হিসেবে পরিচিত ছিল, যেখানে প্রাকৃতিক বন ও জলাভূমি হাতির নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য অপরিহার্য ছিল। কিন্তু বিগত দুই দশকে এই অঞ্চলের দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ন, কৃষি জমির সম্প্রসারণ এবং অবৈধ কাঠ পাচারের কারণে হাতির ঐতিহ্যবাহী চলাচলের পথগুলো সংকুচিত হয়ে এসেছে। এমনকি, ২০১৯ সালে প্রকাশিত বন অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের ২১টি চিহ্নিত হাতি করিডোরের মধ্যে প্রায় ১৩টিতেই মানুষের বসতি স্থাপন ও কার্যক্রম হাতির চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। এই পরিস্থিতি কেবল বন্যপ্রাণীর অস্তিত্বের জন্য হুমকি নয়, বরং মানুষ-হাতি দ্বন্দ্বকেও আরও তীব্র করে তুলছে, যার ফলস্বরূপ উভয়পক্ষের হতাহতের ঘটনা ক্রমবর্ধমান।

বাংলাদেশের বনভূমি, বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল, এশীয় হাতির প্রধান আবাসস্থল। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ২৬৮টি এশীয় হাতি রয়েছে, যার একটি বড় অংশই এই করিডোরগুলো ব্যবহার করে। কিন্তু এই করিডোরগুলোতে মানুষের বসতি স্থাপন, রাস্তা নির্মাণ, কৃষিজমি সম্প্রসারণ এবং শিল্পায়নের কারণে হাতির প্রাকৃতিক আবাসের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ এবং এর আশেপাশের এলাকায় পর্যটন শিল্পের বিকাশের ফলে হাতির ঐতিহ্যবাহী বিচরণক্ষেত্রগুলো বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একইসাথে, DAE (Department of Agricultural Extension) এর সহায়তায় ধান, ভুট্টা এবং সবজির মতো ফসলের চাষ বাড়ায়, হাতি খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে প্রবেশ করছে, যা মানুষ ও হাতির মধ্যে সংঘাতের প্রধান কারণ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর নতুন উচ্চ ফলনশীল জাতের শস্যগুলো কৃষকদের জন্য লাভজনক হলেও, হাতির খাদ্য হিসেবে এগুলোর আকর্ষণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যা প্রাকৃতিকভাবে হাতির বিচরণ আচরণকে প্রভাবিত করছে।

এই সংকট নিরসনে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) বন্যপ্রাণী দ্বারা ফসলের ক্ষতির বিষয়ে গবেষণা করলেও, এর বাস্তবায়ন ও কৃষকদের ক্ষতিপূরণ প্রদানে দীর্ঘসূত্রিতা বিদ্যমান। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় যদিও বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ প্রণয়ন করেছে, তবে এর কার্যকর প্রয়োগ এবং হাতি করিডোরগুলো পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে এখনও বহুলাংশে পিছিয়ে আছে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প, যেমন ইটভাটা স্থাপন, পাহাড় কাটা এবং বনভূমি পরিষ্কার করে ঘরবাড়ি নির্মাণ, এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। এমনকি, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিশাল বনভূমি উজাড় হয়েছে, যা হাতির আবাসস্থল ও করিডোরগুলোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই স্থানচ্যুতি হাতির প্রজনন এবং খাদ্যের উৎসকেও প্রভাবিত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের প্রজাতিগত অস্তিত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে।

বছর হাতি দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ফসলি জমি (হেক্টর) মানুষের হাতে নিহত হাতি হাতির আক্রমণে নিহত মানুষ বনভূমি হ্রাস (বর্গ কিমি)
২০১০-২০১৪ ৩৮০ ১২ ৭৮ ৭৫
২০১৫-২০১৯ ৫৫০ ১৯ ৯৫ ১১০
২০২০-২০২৪ (প্রাক্কলিত) ৭৩০ ২৫ ১২০ ১৪০

উৎস: বন অধিদপ্তর, পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় এনজিও প্রতিবেদন সমন্বিত উপাত্ত।

সুপারিশ

  • পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ এর অধীনে হাতি করিডোরগুলোকে 'সংরক্ষিত বনাঞ্চল' হিসেবে ঘোষণা করে অবিলম্বে সকল প্রকার মানব বসতি ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে এবং করিডোরগুলোর প্রাকৃতিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কার্যক্রম শুরু করতে হবে।
  • কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন DAE, BARI এবং BRRI-কে যৌথভাবে হাতি-প্রতিরোধী ফসলের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে গবেষণা জোরদার করতে হবে এবং কৃষকদের মধ্যে এই জাতগুলো চাষে উৎসাহিত করার জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC)-এর মাধ্যমে বিশেষ প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে।
  • স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে 'জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি-২০১০' এবং 'বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কৌশল' অনুযায়ী হাতি করিডোর এলাকায় নতুন কোনো অবকাঠামো নির্মাণ বা বসতি স্থাপনের অনুমতি না দেওয়ার জন্য কঠোর বিধিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে, এবং বিদ্যমান অবকাঠামোগুলোকে হাতির চলাচলে বিঘ্ন না ঘটিয়ে সহাবস্থানের জন্য উপযুক্ত রূপান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাবীর হোসেন

জাবীর হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator