বন্ড মার্কেট: শেয়ারবাজারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনার তলানি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বন্ড মার্কেট: শেয়ারবাজারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনার তলানি

তানভীর আহমেদ  avatar   
তানভীর আহমেদ
বন্ড মার্কেট: শেয়ারবাজারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনার তলানি
বন্ড মার্কেট: শেয়ারবাজারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনার তলানি
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক কর্পোরেট বন্ডের তালিকাভুক্তির শর্ত শিথিলকরণ এবং লেনদেন সহজীকরণের লক্ষ্যে নতুন নীতিমালা প্...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক কর্পোরেট বন্ডের তালিকাভুক্তির শর্ত শিথিলকরণ এবং লেনদেন সহজীকরণের লক্ষ্যে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ দেশের পুঁজিবাজারের একটি সুপ্ত সম্ভাবনাকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। যেখানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE) মূলত ইক্যুইটি নির্ভর একটি বাজার হিসেবে পরিচিত, সেখানে বন্ড মার্কেট, বিশেষ করে কর্পোরেট বন্ডের বিশাল সম্ভাবনা অনেকটাই অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে, যখন তারল্য সংকট এবং উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করছে, তখন একটি শক্তিশালী এবং সক্রিয় বন্ড মার্কেট স্থিতিশীলতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী পুঁজি সংগ্রহের এক নির্ভরযোগ্য উৎস হতে পারে, যা আমাদের দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামো উন্নয়নে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করবে।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বন্ডের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই প্রান্তিক। যেখানে ইক্যুইটি মার্কেটে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়, সেখানে বন্ড মার্কেটে এই অঙ্ক প্রায়শই একক অংকে সীমাবদ্ধ থাকে, এমনকি অনেকদিন কোনো লেনদেনই হয় না। অথচ, CDBL (সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড)-এর তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বন্ড তালিকাভুক্ত রয়েছে। সরকারি ট্রেজারি বন্ডগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন হলেও, কর্পোরেট বন্ডের ক্ষেত্রে তারল্যের অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, প্রাথমিক বাজারে বন্ডের ইস্যু প্রক্রিয়া জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণ, এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বন্ড সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব। উপরন্তু, কর্পোরেট বন্ডের জন্য একটি কার্যকর সেকেন্ডারি মার্কেট গড়ে না ওঠায়, বিনিয়োগকারীরা একবার বন্ড কিনলে তা সহজে বিক্রি করতে পারেন না, যা তাদের আগ্রহকে দমিয়ে রাখে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য BSEC-এর সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো, যেমন ইলেক্ট্রনিক বিডিং সিস্টেম চালু করা এবং তালিকাভুক্তির ফি কমানো, অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে, তবে এর বাস্তবায়ন এবং ফলাফল নির্ভর করবে বাজারের অন্যান্য অংশীদারদের সক্রিয় অংশগ্রহণের উপর।

বন্ড মার্কেটের অপ্রতুলতার কারণে দেশের বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদী পুঁজি সংগ্রহের জন্য ব্যাংক ঋণের উপর অত্যধিক নির্ভরশীল। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘমেয়াদী তহবিল ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি হয় এবং উচ্চ সুদের হার দেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করে। একটি শক্তিশালী কর্পোরেট বন্ড মার্কেট এই চাপ কমাতে পারে এবং বিভিন্ন খাতের কোম্পানিগুলোকে অপেক্ষাকৃত কম সুদে এবং দীর্ঘমেয়াদী শর্তে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ করে দিতে পারে। যেমন, বিদ্যুৎ খাত, যোগাযোগ খাত বা বৃহৎ উৎপাদনমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সম্প্রসারণের জন্য বন্ড ইস্যু করে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। এতে একদিকে যেমন ব্যাংকগুলোর তারল্য ঝুঁকি কমে, তেমনি অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরাও ইক্যুইটির তুলনায় কম ঝুঁকিতে একটি স্থিতিশীল আয়ের উৎস খুঁজে পায়। উদাহরণস্বরূপ, উন্নত দেশগুলোতে, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে, বন্ড মার্কেট ইক্যুইটি মার্কেটের চেয়েও বড় এবং বেশি সক্রিয়, যা তাদের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য শুধু নীতি প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কার্যকর বাজার উন্নয়ন, বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং একটি শক্তিশালী রেটিং ব্যবস্থার প্রবর্তন।

দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নে বন্ড মার্কেটের ভূমিকা:

অর্থবছরের নাম মোট ইক্যুইটি মূলধন সংগ্রহ (কোটি টাকা) মোট বন্ড মূলধন সংগ্রহ (কোটি টাকা) বন্ডের অনুপাত (%)
২০১৮-১৯ ৪,১২২ ৫০০ ১১.৯৯
২০১৯-২০ ৩,৭৮৬ ১,০০০ ২০.৯১
২০২০-২১ ৪,৭৮৯ ১,৩০০ ২১.৩৩
২০২১-২২ ৫,৯২০ ১,৪৫০ ১৯.৬৬
২০২২-২৩ ৪,৫৫০ ১,২০০ ২০.৮৭

উৎস: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এবং ডিএসই (DSE) বার্ষিক প্রতিবেদন

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক কর্পোরেট বন্ডের তালিকাভুক্তি ও লেনদেন সহজীকরণে প্রণীত নতুন নীতিমালা দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং একইসাথে করনীতিতে বন্ড বিনিয়োগের জন্য বিশেষ প্রণোদনা (যেমন, কর অব্যাহতি বা হ্রাসকৃত কর হার) চালু করা, যা প্রাতিষ্ঠানিক ও খুচরা উভয় প্রকার বিনিয়োগকারীকে বন্ডে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে।
  • ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE) উভয়কেই বন্ডের সেকেন্ডারি মার্কেটে তারল্য বাড়ানোর জন্য একটি ডেডিকেটেড ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে এবং নিয়মিতভাবে বন্ড লেনদেনের প্রচার ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কর্মশালা ও সেমিনারের আয়োজন করতে হবে, যেখানে CDBL-কে ডেটা সরবরাহ ও কারিগরি সহায়তা দিতে হবে।
  • বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়কে সরকারি ট্রেজারি বন্ড এবং সুকুকের পাশাপাশি কর্পোরেট বন্ডের জন্য একটি সমন্বিত বাজার উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করতে হবে, যেখানে ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোর ভূমিকা আরও শক্তিশালী ও স্বচ্ছ করা হবে, যাতে বিনিয়োগকারীরা বন্ডের ঝুঁকি সম্পর্কে সঠিক ধারণা পায় এবং বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানভীর আহমেদ

তানভীর আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শেয়ারবাজার ও ক্যাপিটাল মার্কেট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator