বিষাক্ত খাদ্য: জনস্বাস্থ্যের নীরব ঘাতক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিষাক্ত খাদ্য: জনস্বাস্থ্যের নীরব ঘাতক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার চ্যালেঞ্জ

ফারজানা আহমেদ  avatar   
ফারজানা আহমেদ
বিষাক্ত খাদ্য: জনস্বাস্থ্যের নীরব ঘাতক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার চ্যালেঞ্জ
বিষাক্ত খাদ্য: জনস্বাস্থ্যের নীরব ঘাতক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে খাদ্য ভেজাল এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করেছে, যা প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষের জীবন ও সুস্থতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। অতি মুনাফার লোভে একশ্রেণির অসাধ...

বাংলাদেশে খাদ্য ভেজাল এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করেছে, যা প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষের জীবন ও সুস্থতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। অতি মুনাফার লোভে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী খাদ্যপণ্যে মেশাচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিক এবং নিম্নমানের উপাদান, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের মতো মরণব্যাধির কারণ হচ্ছে। জাতিসংঘের এক যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, দেশের এক-তৃতীয়াংশের বেশি খাদ্যপণ্যেই ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি রয়েছে এবং ভেজাল খাদ্যের কারণে বছরে ৪৫ লাখ মানুষ জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এমনকি, ভেজাল খাদ্যের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে বলে এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)-এর মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভূমিকা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

খাদ্য ভেজালের ধরন সময়ের সাথে সাথে আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। মাছ তাজা রাখতে ফরমালিন, ফল পাকাতে কার্বাইড, দুধে মেলামিন, শুঁটকিতে কীটনাশক, এমনকি মুড়িতে ইউরিয়া মেশানো হচ্ছে। সম্প্রতি, মুরগির মাংসে ভারী ধাতু এবং খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্যও গবেষণায় উঠে এসেছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পানি থেকে শুরু করে মাছ, মাংস, ফল, মসলা এবং বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর মাত্রায় রাসায়নিক ও জীবাণু পাওয়া গেছে। রাজশাহী ও গাজীপুরের গুড়ের নমুনায় নিষিদ্ধ সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট এবং কুমিল্লা, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও হবিগঞ্জের বিস্কুটে নিষিদ্ধ রাসায়নিক শনাক্ত হয়েছে। এসব বিষাক্ত উপাদান মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করে এবং ডিএনএ পর্যন্ত পরিবর্তন করতে পারে, যা গর্ভবতী মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এর অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) এবং পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে বিএসটিআই। এই সংস্থাগুলো নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ভেজালবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের জরিমানা করছে। বিশেষ করে রমজান মাসে ইফতারি ও নিত্যপণ্যের মান যাচাইয়ে বিএসটিআই সারা দেশে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। সাম্প্রতিক সময়ে বিএসটিআই লাইসেন্স ছাড়া লোগো ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদন এবং ওজনে কারচুপির অভিযোগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছে। তবে, এত অভিযান সত্ত্বেও ভেজালের মাত্রা কমছে না, বরং ধরন পাল্টাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বিএফএসএ-এর অভিযান কমে গেছে, যা ভেজালকারীদের আরও উৎসাহিত করছে। এছাড়া, বিএসটিআই বাধ্যতামূলক মান সনদের আওতায় পণ্যের সংখ্যা বাড়ালেও, সে অনুযায়ী সংস্থাটির সক্ষমতা বাড়ছে না, যা মান নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিএসটিআই-এর চট্টগ্রাম কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে প্রশাসনিক অনিয়ম, ব্যক্তি সখ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে পদোন্নতি ও বদলির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভ্যন্তরীণ অনিয়ম সংস্থার সামগ্রিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ অনুযায়ী, ভেজাল খাদ্য উৎপাদন বা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে মজুত, সরবরাহ বা বিপণন করলে এক থেকে তিন বছর কারাদণ্ড বা তিন থেকে ছয় লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। এমনকি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে ভেজাল খাদ্য প্রস্তুত বা বিক্রয়ের জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে। কিন্তু আইনের কঠোর প্রয়োগের অভাবে অপরাধীরা প্রায়শই পার পেয়ে যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্ন আইনের আওতায় অভিযান পরিচালনা করায় এবং একই অপরাধের জন্য বিভিন্ন মেয়াদ ও পরিমাণের শাস্তির বিধান থাকায় তাৎক্ষণিক বিচারে ভিন্ন ভিন্ন সাজা দেওয়া হচ্ছে, যা এক ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি করছে।

খাদ্য ভেজাল রোধে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, এর যথাযথ প্রয়োগ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। জনস্বাস্থ্যের এই চরম ঝুঁকি থেকে মুক্তি পেতে হলে ভেজাল বিরোধী অভিযানকে আরও জোরদার করতে হবে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে, বিএসটিআই ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে কঠোর নজরদারি এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে জনস্বাস্থ্যকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।

সুপারিশ: খাদ্য ভেজাল রোধে একটি সমন্বিত ও বহু-মাত্রিক কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, বিএসটিআই ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের জনবল, ল্যাবরেটরি সুবিধা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে তারা বর্ধিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজার তদারকি কার্যকরভাবে করতে পারে। দ্বিতীয়ত, ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, এক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাবমুক্ত বিচার প্রক্রিয়া অত্যাবশ্যক। তৃতীয়ত, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করে একটি শক্তিশালী সমন্বিত মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, কৃষকদের মধ্যে নিরাপদ ফসল উৎপাদন এবং রাসায়নিকের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং জৈব কৃষি পদ্ধতিকে উৎসাহিত করতে হবে। পঞ্চমত, ভোক্তাদের মধ্যে ভেজাল খাদ্য চিহ্নিতকরণ ও এর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর বিষয়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। পরিশেষে, বিএসটিআই-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যেকোনো ধরনের প্রশাসনিক অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত, যাতে সংস্থার কার্যকারিতা ও জনআস্থা ফিরে আসে।


🔎 অনুসন্ধানে: ফারজানা আহমেদ

ফারজানা আহমেদ, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: খাদ্য ভেজাল ও বিএসটিআই (BSTI) ওয়াচ।

Geen reacties gevonden


News Card Generator