ব্রেন ড্রেন ও মেধা পাচার: উচ্চশিক্ষায় শূন্যতা, গবেষণায় স্থবিরতা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ব্রেন ড্রেন ও মেধা পাচার: উচ্চশিক্ষায় শূন্যতা, গবেষণায় স্থবিরতা

ড. জহিরুল ইসলাম  avatar   
ড. জহিরুল ইসলাম
ব্রেন ড্রেন ও মেধা পাচার: উচ্চশিক্ষায় শূন্যতা, গবেষণায় স্থবিরতা
ব্রেন ড্রেন ও মেধা পাচার: উচ্চশিক্ষায় শূন্যতা, গবেষণায় স্থবিরতা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২২ অনুসারে, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের পর...

সম্প্রতি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২২ অনুসারে, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ মোট বাজেটের ১ শতাংশেরও কম, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি উচ্চশিক্ষায় আমাদের দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের এক বিবর্ণ চিত্র তুলে ধরে, যা পরোক্ষভাবে দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিদেশে পাড়ি জমানোর অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। গবেষণা ও উদ্ভাবনে পর্যাপ্ত সুযোগের অভাবে প্রতি বছর হাজার হাজার তরুণ মেধা উন্নত জীবনের অন্বেষণে পশ্চিমা দেশগুলোতে পা বাড়াচ্ছে, যা 'ব্রেন ড্রেন' বা মেধা পাচারের সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলছে। এই প্রবণতা দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এক গভীর শূন্যতা তৈরি করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় উন্নয়নের গতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এই দুর্বল গবেষণা সংস্কৃতি মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের দ্বার উন্মোচন করছে, যেখানে তারা উন্নত ল্যাব, পর্যাপ্ত ফান্ডিং এবং সম্মানজনক কর্মপরিবেশের হাতছানি পায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) এর এক সমীক্ষায় দেখা যায়, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমানো শিক্ষার্থীদের সংখ্যা প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১০-১৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আর দেশে ফিরে আসে না, কারণ তাদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার সঠিক মূল্যায়ন এবং প্রয়োগের সুযোগ এখানে সীমিত। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মেধাবীরা উন্নত দেশগুলোতে আকৃষ্ট হচ্ছে, যেখানে তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও আর্থিক সহায়তা বিদ্যমান। দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকেও পিএইচডি বা পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণার জন্য বিদেশে যাওয়া গবেষকদের একটি বড় অংশ সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন, যা দেশের গবেষণা ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব গড়ে ওঠার পথে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।

মেধা পাচারের এই ধারা কেবল উচ্চশিক্ষায় শূন্যতাই তৈরি করছে না, এটি দেশের সামগ্রিক গবেষণার সক্ষমতাকেও স্থবির করে দিচ্ছে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বারবার উল্লেখ করেছে যে, দেশের শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে না, এবং বিদ্যমান জনশক্তির দক্ষতা উন্নয়নে গবেষণার অভাব প্রকট। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এর তথ্য অনুযায়ী, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে (TVET) ভর্তির হার বাড়লেও, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উদ্ভাবনমূলক গবেষণার সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক কারিগরি স্নাতকও উন্নত কর্মজীবনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত স্ট্রেনদেনিং এক্টিভিটিজ ফর হাইয়ার এডুকেশন প্রজেক্ট (SEIP) এর মতো উদ্যোগগুলো দক্ষতা উন্নয়নে সহায়ক হলেও, মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণায় বিনিয়োগের অভাব দেশের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে পিছিয়ে দিচ্ছে। ফলস্বরূপ, আমরা বিদেশি প্রযুক্তির ওপর অধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি এবং নিজস্ব উদ্ভাবন ও পেটেন্টের সংখ্যা অত্যন্ত কম থাকছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্বনির্ভরতার জন্য হুমকিস্বরূপ।

বছর বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা উচ্চশিক্ষায় গবেষণা খাতে ইউজিসি বরাদ্দ (মোট বাজেটের %) বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান
২০১৮ ৫২,৪৫৩ ০.৮৫% ১১২তম
২০১৯ ৫৯,৭৬৪ ০.৯২% ১০৮তম
২০২০ ৬৭,০৮৫ ০.৯৮% ১১৬তম
২০২১ ৭৫,১১০ ০.৯৬% ১১৬তম
২০২২ ৮২,৭৫০ ০.৯৯% ১১৪তম

উৎস: ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিস্টিক্স (UIS), বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) বার্ষিক প্রতিবেদন, গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স (GII)

সুপারিশ

  • উচ্চশিক্ষায় গবেষণা খাতে জাতীয় বাজেটের ন্যূনতম ২% বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে এবং এই অর্থ ব্যবহারের জন্য ইউজিসি-এর মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে গবেষণার গুণগত মান ও ফলাফলকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-কে যৌথভাবে শিল্প ও academia-এর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে, শিল্প-নির্দিষ্ট গবেষণা ও উদ্ভাবনী প্রকল্পগুলোতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) মডেল চালু করতে হবে এবং SEIP-এর মতো প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে মেধাবীদের জন্য বিশেষ বৃত্তি ও ফেলোশিপ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে, যা দেশে গবেষণার পরিবেশ উন্নত করবে।
  • মেধাবীদের দেশে ধরে রাখতে এবং বিদেশে পাচার রোধে "বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা গবেষণা ও উদ্ভাবন আইন" প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে গবেষকদের জন্য আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো, উন্নত গবেষণাগার সুবিধা, গবেষণা অনুদান প্রাপ্তির সহজ প্রক্রিয়া এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির (Intellectual Property - IP) সুরক্ষার জন্য কঠোর বিধিমালা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. জহিরুল ইসলাম

ড. জহিরুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্রেন ড্রেন ও মেধা পাচার। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator