জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: বিরল রোগ নির্ণয়ে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: বিরল রোগ নির্ণয়ে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ড. আদনান সামি  avatar   
ড. আদনান সামি
জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: বিরল রোগ নির্ণয়ে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: বিরল রোগ নির্ণয়ে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
২০২৩ সালের শেষভাগে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগে সফলভাবে একটি বিরল স্নায়বিক রোগের ...

২০২৩ সালের শেষভাগে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগে সফলভাবে একটি বিরল স্নায়বিক রোগের জিনোমিক ডায়াগনোসিস সম্পন্ন হয়, যা বাংলাদেশের চিকিৎসা ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই সাফল্য শুধু একটি একক রোগীর জন্য আশার আলো নয়, বরং এটি জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তির মাধ্যমে বিরল রোগ নির্ণয়ে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। একসময় যে রোগগুলির নির্ণয় প্রায় অসম্ভব বলে মনে করা হত, এখন অত্যাধুনিক জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি এবং বায়োইনফরমেটিক্সের ব্যবহারের মাধ্যমে সেগুলির রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হচ্ছে, যা দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে এক বিপ্লব ঘটাতে পারে।

বিরল রোগ নির্ণয়ে জিনোমিক্স প্রযুক্তির প্রয়োগ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করে। একদিকে, দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসংখ্য বিরল জেনেটিক রোগের সুপ্ত উপস্থিতি রয়েছে, যা প্রায়শই ভুল রোগ নির্ণয় বা বিলম্বে চিকিৎসার কারণে জটিল আকার ধারণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭,০০০ বিরল রোগের অস্তিত্ব রয়েছে এবং এর প্রায় ৮০% জেনেটিক কারণে ঘটে থাকে। বাংলাদেশে, সঠিক ডেটা অনুপস্থিত থাকলেও, এই রোগগুলির প্রকোপ কম নয়। উদাহরণস্বরূপ, থ্যালাসেমিয়া, সিস্টিক ফাইব্রোসিস, স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রোফি (SMA) এবং বিভিন্ন ধরনের মেটাবলিক ডিসঅর্ডারের মতো বিরল রোগগুলির সনাক্তকরণে জিনোমিক স্ক্রিনিং অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হতে পারে। বর্তমানে, আইইডিসিআর (IEDCR) কিছু সংক্রামক রোগের জিনোমিক নজরদারি করলেও, বিরল জেনেটিক রোগের ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ এখনও সীমিত। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে রোগের সঠিক কারণ উদঘাটন করে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি (Precision Medicine) প্রয়োগের পথ সুগম হয়, যা প্রচলিত লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। বিশেষ করে, নবজাতক এবং শিশুদের মধ্যে দেখা দেওয়া জেনেটিক ত্রুটিজনিত রোগগুলির দ্রুত ও নির্ভুল নির্ণয় তাদের জীবন রক্ষায় এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য জটিলতা এড়াতে অপরিহার্য।

তবে, এই সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। জিনোম সিকোয়েন্সিং এবং বায়োইনফরমেটিক্স বিশ্লেষণের জন্য প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, যেমন নেক্সট-জেন সিকোয়েন্সার (Next-Gen Sequencer), এবং উচ্চ প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব বাংলাদেশে প্রকট। বর্তমানে, হাতেগোনা কয়েকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত পরিসরে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সমগ্র দেশের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। এছাড়াও, জিনোমিক ডেটা সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং এর গোপনীয়তা রক্ষা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সংগৃহীত জিনোমিক ডেটার বিশাল ভাণ্ডার প্রক্রিয়াকরণের জন্য শক্তিশালী কম্পিউটার অবকাঠামো এবং ডেটা বিজ্ঞানীদের প্রয়োজন। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) যদিও নতুন ঔষধ ও চিকিৎসার অনুমোদন দেয়, কিন্তু জেনেটিক থেরাপি বা জিন-সম্পর্কিত ডায়াগনস্টিক কিটের অনুমোদনের ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা ও নির্দিষ্ট নীতিমালা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (NIMH) মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে জেনেটিক্স ও নিউরোসায়েন্সের সংযোগ নিয়ে কাজ শুরু করলেও, সামগ্রিকভাবে বিরল রোগের জিনোমিক ডায়াগনোসিসকে একটি জাতীয় স্বাস্থ্য কর্মসূচির আওতায় আনা এখনো বাকি। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছাড়া এই প্রযুক্তির সর্বজনীন ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন। এছাড়াও, জিনোমিক পরীক্ষার উচ্চ ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, যা এর ব্যাপক প্রসারে একটি বড় বাধা।

প্রতিষ্ঠানের নাম ভূমিকা/কার্যক্রম জিনোমিক্স ও বিরল রোগ সংক্রান্ত বর্তমান অবস্থা (আনুমানিক)
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন বিরল রোগের জিনোমিক স্ক্রিনিং বা ডায়াগনোসিসের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট জাতীয় কর্মসূচি নেই।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়ন ও বাজেট বরাদ্দ জিনোমিক্স প্রযুক্তির জন্য বাজেট বরাদ্দ ও নীতিগত সহায়তা সীমিত।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) সংক্রামক রোগের গবেষণা ও নিয়ন্ত্রণ কিছু সংক্রামক রোগের (যেমন কোভিড-১৯) জিনোমিক নজরদারি করে, বিরল জেনেটিক রোগের ক্ষেত্রে প্রয়োগ সীমিত।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (NIMH) মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণা মানসিক রোগের জেনেটিক ভিত্তি অনুসন্ধানে প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষণা কার্যক্রম চলমান।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) ঔষধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণ জিনোমিক ডায়াগনস্টিক কিট বা জেনেটিক থেরাপির অনুমোদনের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও সক্ষমতা বিকাশের প্রয়োজন।

উৎস: বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন ও প্রকাশনা, এবং বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে সংকলিত।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) একটি জাতীয় জিনোমিক্স কৌশলপত্র প্রণয়ন করুক, যার অধীনে বিরল রোগ নির্ণয়ে জিনোমিক স্ক্রিনিং ও ডায়াগনোসিসকে অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই কৌশলে DGHS এর মাধ্যমে প্রতিটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জিনোম সিকোয়েন্সিং ল্যাব স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় জনবল (জেনেটিসিস্ট, বায়োইনফরমেটিসিয়ান) প্রশিক্ষণের জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ ও কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে।
  • IEDCR এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করে তাদের একটি জাতীয় বিরল রোগ জিনোমিক ডেটাবেস (National Rare Disease Genomic Database) তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হোক, যা বাংলাদেশের জনসংখ্যার জেনেটিক বৈচিত্র্য এবং বিরল রোগের প্রকোপ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করবে। DGDA এই ডেটাবেসের তথ্যের ভিত্তিতে জেনেটিক টেস্টিং কিট ও থেরাপির দ্রুত অনুমোদনের জন্য একটি ত্বরিত নীতি (Fast-Track Policy) প্রণয়ন করবে।
  • NIMH, IEDCR এবং দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে যৌথভাবে একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিসার্চ সেন্টার (Multi-disciplinary Research Center) প্রতিষ্ঠা করা হোক, যা জিনোমিক্স, বায়োইনফরমেটিক্স এবং বায়োটেকনোলজিতে গবেষণা ও উন্নয়নে নেতৃত্ব দেবে। এই সেন্টার জিনোমিক ডেটা বিশ্লেষণ, নতুন ডায়াগনস্টিক পদ্ধতির উদ্ভাবন এবং বিরল রোগের জন্য স্থানীয়ভাবে সাশ্রয়ী জিনোমিক সমাধান তৈরিতে মনোনিবেশ করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. আদনান সামি

ড. আদনান সামি 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator