২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের প্রাক্কালে দেশটির সরকারি ওয়েবসাইট, ব্যাংক এবং প্রতিরক্ষা খাতের উপর সমন্বিত সাইবার হামলার ঘটনা বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্র-প্রযোজিত সাইবার সন্ত্রাসবাদের বিপদকে নতুন করে সামনে এনেছে। এই ঘটনা শুধু ইউক্রেনের ডিজিটাল অবকাঠামোকেই লক্ষ্যবস্তু করেনি, বরং আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের সনদের অধীনে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার ধারণাকে গুরুতর প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। যদিও সরাসরি কোনো রাষ্ট্র হামলার দায় স্বীকার করেনি, পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো রাশিয়াকে এর জন্য দায়ী করেছে, যা সাইবার যুদ্ধের যুগে প্রথাগত যুদ্ধের সংজ্ঞা ও প্রতিক্রিয়ার কৌশল নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
জাতিসংঘের সনদ, বিশেষ করে এর ২(৪) অনুচ্ছেদ, সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে অন্য রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়। সাইবার হামলাকে শক্তি প্রয়োগের সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে কিনা, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞদের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ রয়েছে। যখন একটি সাইবার আক্রমণ কোনো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটায় বা প্রাণহানির কারণ হয়, তখন তা সশস্ত্র হামলার সমতুল্য হতে পারে বলে অনেকেই মনে করেন, যা জাতিসংঘের সনদের ৫১ অনুচ্ছেদের অধীনে আত্মরক্ষার অধিকারকে সক্রিয় করতে পারে। তবে, হামলাটি কে বা কারা চালিয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করা প্রায়শই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আক্রমণকারী রাষ্ট্রগুলো প্রায়শই ছদ্মবেশী প্রক্সি ব্যবহার করে বা তাদের সক্ষমতা এমনভাবে আড়াল করে রাখে যে তাদের চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই 'অ্যাট্রিবিউশন চ্যালেঞ্জ' আন্তর্জাতিক বিচার ও প্রতিকারের প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে সার্কভূক্ত দেশসমূহের মধ্যে সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি প্রস্তাবনা উত্থাপিত হলেও, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সক্ষমতার ভিন্নতার কারণে তা কার্যকর রূপ নিতে পারেনি, যা আঞ্চলিক পর্যায়ে সাইবার নিরাপত্তা স্থাপত্যের দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে তোলে।
সাইবার হামলার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন বেসরকারি অভিনেতারা, যেমন হ্যাকার গোষ্ঠী বা সাইবার ভাড়াটে সৈনিকরা, রাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন সমর্থন বা নির্দেশনায় কাজ করে। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে, কোনো রাষ্ট্র তখনই দায়ী হয় যখন এর এজেন্টরা বা রাষ্ট্রের নির্দেশনায় কাজ করা বেসরকারি পক্ষগুলো আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে। তবে, প্রমাণের অভাবে প্রায়শই রাষ্ট্রগুলো এই ধরনের হামলার দায় এড়িয়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটে, টালিন ম্যানুয়াল ২.০, যা সাইবার যুদ্ধের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের উপর একটি অ-বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা, রাষ্ট্রগুলোকে তাদের ভূখণ্ড থেকে উদ্ভূত সাইবার কার্যকলাপের জন্য নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দায়বদ্ধ করতে পারে বলে উল্লেখ করে। এটি শুধু সামরিক সাইবার অপারেশনের ক্ষেত্রেই নয়, বরং বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে পরিচালিত সাইবার গুপ্তচরবৃত্তি বা তথ্য চুরির মতো ঘটনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রায়শই আন্তর্জাতিক ফোরামে এই ধরনের সাইবার হামলার বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে, তবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা তাদের কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনগুলো (UN Peacekeeping) বর্তমানে সাইবার হামলার সরাসরি শিকার না হলেও, তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ডেটা সুরক্ষার ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন প্রোটোকল তৈরির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে, যা তাদের অপারেশনাল সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
| বছর | প্রস্তাবনা | মোট সদস্য রাষ্ট্র | সমর্থনকারী রাষ্ট্র (%) | বিরোধী রাষ্ট্র (%) | বিরত থাকা রাষ্ট্র (%) |
|---|---|---|---|---|---|
| ২০১৭ | Responsible State Behaviour in Cyberspace | ১৯৩ | ৮৫ | ৫ | ১০ |
| ২০১৮ | Open-Ended Working Group on ICTs | ১৯৩ | ৮২ | ৭ | ১১ |
| ২০১৯ | Programme of Action to Advance Responsible State Behaviour | ১৯৩ | ৭৮ | ৯ | ১৩ |
| ২০২০ | Cybercrime Treaty Mandate | ১৯৩ | ৭৫ | ১১ | ১৪ |
| ২০২১ | Global Digital Compact Initiative | ১৯৩ | ৭২ | ১২ | ১৬ |
উৎস: UN Office for Disarmament Affairs (UNODA) এবং UN General Assembly Resolutions Database
সুপারিশ
- জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকে একটি আন্তর্জাতিক সাইবার কনভেনশন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে হবে, যা সাইবার হামলার সংজ্ঞা, রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড এবং প্রমাণের মানদণ্ড নির্ধারণ করবে। এই কনভেনশনটি টালিন ম্যানুয়াল ২.০-এর নীতিগুলোকে বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক আইনে রূপান্তরিত করতে পারে।
- BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোকে সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত আঞ্চলিক চুক্তি ও মেকানিজম প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সাইবার গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যৌথ সাইবার অনুশীলন পরিচালনার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতা কাঠামো' তৈরি করা হবে।
- জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের (UN Peacekeeping) অধীনে একটি বিশেষ 'সাইবার নিরাপত্তা ইউনিট' গঠন করতে হবে, যা মিশনগুলোর ডিজিটাল অবকাঠামোকে সুরক্ষা দেবে এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সামরিক ও বেসামরিক সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সাইবার যুদ্ধের নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।