জাহাজ ভাঙা শিল্পের নিরাপত্তা সংকট: সবুজ মানদণ্ড ও শ্রমিকের জীবন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জাহাজ ভাঙা শিল্পের নিরাপত্তা সংকট: সবুজ মানদণ্ড ও শ্রমিকের জীবন

জাহাঙ্গীর আলম  avatar   
জাহাঙ্গীর আলম
জাহাজ ভাঙা শিল্পের নিরাপত্তা সংকট: সবুজ মানদণ্ড ও শ্রমিকের জীবন
জাহাজ ভাঙা শিল্পের নিরাপত্তা সংকট: সবুজ মানদণ্ড ও শ্রমিকের জীবন
ছবি: সংগৃহীত
২০২২ সালে সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় অন্তত ৬ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু এবং আরও ৩০ জনের অধিক গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের...

২০২২ সালে সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় অন্তত ৬ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু এবং আরও ৩০ জনের অধিক গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পের নিরাপত্তা সংকটকে আবারও সামনে এনেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং এই শিল্পের দীর্ঘদিনের পুরোনো অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সবুজ মানদণ্ড পরিপালনে ব্যর্থতার এক চরম উদাহরণ। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এডিবি’র একাধিক প্রতিবেদনে বারবার এই শিল্পের পরিবেশগত ও শ্রম নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হলেও, কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সত্ত্বেও হাজার হাজার শ্রমিকের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছে।

বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প, যা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম হিসেবে পরিচিত, প্রতি বছর প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০টি সমুদ্রগামী জাহাজ পুনর্ব্যবহারযোগ্য ইস্পাতে রূপান্তরিত করে। এই প্রক্রিয়াটি দেশের ইস্পাত শিল্পের কাঁচামালের প্রায় ৭০ শতাংশ যোগান দেয়, যা জাতীয় অর্থনীতিতে বার্ষিক প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি অবদান রাখে। তবে, এই অর্থনৈতিক সাফল্যের আড়ালে রয়েছে এক ভয়াবহ মানবিক ও পরিবেশগত মূল্য। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং গ্রিনপিস-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, এই শিল্পে কাজ করা শ্রমিকরা নিয়মিতভাবে অ্যাসবেস্টস, ভারী ধাতু, পলিক্লোরিনেটেড বাইফেনাইলস (PCBs) এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পদার্থের সংস্পর্শে আসে, যা ক্যান্সার, শ্বাসযন্ত্রের রোগ এবং স্নায়বিক রোগের কারণ। তা সত্ত্বেও, অধিকাংশ ইয়ার্ডে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) সরবরাহ এবং ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম দেখা যায়। বাংলাদেশ সরকার যদিও 'বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন, ২০১৮' এবং 'জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বিধিমালা, ২০২০' প্রণয়ন করেছে, কিন্তু এর বাস্তবায়ন ও তদারকিতে এখনও যথেষ্ট দুর্বলতা বিদ্যমান, যার ফলস্বরূপ শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েই চলেছে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প এখনও পিছিয়ে রয়েছে। হংকং কনভেনশন (Hong Kong International Convention for the Safe and Environmentally Sound Recycling of Ships, 2009) যা নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে, তা বাংলাদেশ এখনও অনুসমর্থন করেনি। এর ফলে, অনেক পুরনো এবং বিপজ্জনক জাহাজ, যা উন্নত দেশগুলোতে ভাঙার অনুমতি পায় না, সেগুলো বাংলাদেশের ইয়ার্ডগুলোতে এসে ভিড় করে। এডিবি’র সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, হংকং কনভেনশন অনুসমর্থন এবং এর বিধানাবলী কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা গেলে জাহাজ ভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনা প্রায় ৭০% হ্রাস পেতে পারে এবং পরিবেশ দূষণ ৪০% পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এছাড়া, আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (IMO) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) কর্তৃক নির্ধারিত কঠোর পরিবেশগত মানদণ্ড পরিপালনের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তাও এই শিল্পে অপ্রতুল। এই শিল্পের আধুনিকীকরণ এবং সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে World Bank এবং বাংলাদেশ সরকার যৌথভাবে 'Ship Recycling Project' এর অধীনে কিছু উদ্যোগ নিলেও, এর গতি অত্যন্ত ধীর এবং অধিকাংশ ইয়ার্ড এখনও সনাতন পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল।

সূচক ২০১৫ ২০১৮ ২০২১ উৎস
জাহাজ ভাঙা শিল্পে বার্ষিক দুর্ঘটনা জনিত মৃত্যু ৩২ ২৫ ১৮ ILO / পরিবেশ অধিদপ্তর
হংকং কনভেনশন মানদণ্ড পরিপালনকারী ইয়ার্ডের সংখ্যা (মোটের %) ৫% ১০% ১৫% World Bank / বাংলাদেশ শিপব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন
পরিবেশগত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট যুক্ত ইয়ার্ডের সংখ্যা (মোটের %) ২% ৫% ১২% পরিবেশ অধিদপ্তর
শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) সরবরাহকারী ইয়ার্ডের সংখ্যা (মোটের %) ১০% ২০% ৩০% ILO / শ্রম মন্ত্রণালয়
শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার আওতায় আনার হার ১৫% ৩০% ৪৫% শ্রম মন্ত্রণালয়

উৎস: বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর, শ্রম মন্ত্রণালয়, ILO, World Bank এবং বাংলাদেশ শিপব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে হংকং কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিসাইক্লিং অফ শিপস (Hong Kong Convention) অনুসমর্থন করতে হবে এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে এর কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য একটি নির্দিষ্ট রোডম্যাপ ও সময়সীমা নির্ধারণ করে দিতে হবে, যেখানে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (IMO) এর প্রযুক্তিগত সহায়তা গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা উচিত।
  • শ্রম মন্ত্রণালয়কে 'বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন, ২০১৮' এবং 'জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বিধিমালা, ২০২০' এর অধীনে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) সরবরাহ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রশিক্ষণের বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, এবং বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সাথে সমন্বয় করে নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়া ও পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
  • World Bank ও ADB এর আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে (যেমন – শিল্প মন্ত্রণালয়) জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট স্থাপন এবং সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহার উৎসাহিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে, যেখানে বিপজ্জনক বর্জ্য (যেমন অ্যাসবেস্টস, PCB) নিষ্কাশনের জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে এবং ইয়ার্ডগুলোর পরিবেশগত নিরীক্ষা (Environmental Audit) বাধ্যতামূলক করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহাঙ্গীর আলম

জাহাঙ্গীর আলম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Walang nakitang komento


News Card Generator