ভেজাল খাদ্যের বিষচক্র: বিএসটিআই নজরদারি ও জনস্বাস্থ্যের নীরব হুমকি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ভেজাল খাদ্যের বিষচক্র: বিএসটিআই নজরদারি ও জনস্বাস্থ্যের নীরব হুমকি

ফারজানা আহমেদ  avatar   
ফারজানা আহমেদ
ভেজাল খাদ্যের বিষচক্র: বিএসটিআই নজরদারি ও জনস্বাস্থ্যের নীরব হুমকি
ভেজাল খাদ্যের বিষচক্র: বিএসটিআই নজরদারি ও জনস্বাস্থ্যের নীরব হুমকি
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের খাদ্য ব্যবস্থায় ভেজাল একটি দীর্ঘস্থায়ী ও জনস্বাস্থ্য বিধ্বংসী সমস্যা, যা প্রতিনিয়ত কোটি কোটি মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস...

বাংলাদেশের খাদ্য ব্যবস্থায় ভেজাল একটি দীর্ঘস্থায়ী ও জনস্বাস্থ্য বিধ্বংসী সমস্যা, যা প্রতিনিয়ত কোটি কোটি মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও ভেজাল রোধে কাজ করলেও, এর কার্যক্রমের কার্যকারিতা এবং অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলো প্রায়শই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযান, তদন্ত এবং প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো এই খাতের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং দুর্বল নজরদারির কারণে ভেজালকারীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে পবিত্র রমজান মাসকে সামনে রেখে বিএসটিআই ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্যের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করে। এই অভিযানে পরীক্ষিত ৭৫০টি নমুনার মধ্যে ৪৯টি পণ্য নিম্নমানের বা ভেজালযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় বাজার থেকে প্রত্যাহার করা হয়। একটি কারখানা সিলগালা করা হয় এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উপর ১.৩২ মিলিয়ন টাকা জরিমানা আরোপ করা হয়। গত সাত মাসে ১০৩টি কারখানা ও পেট্রোল পাম্প সিলগালা করা হয়েছে, ১,৪৭০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়েছে এবং ৩৫.৮৫ মিলিয়ন টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। একই বছরের জুলাই মাসে বিএসটিআই চারটি প্রতিষ্ঠানের আট ধরনের পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়, কারণ ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় সেগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ, ক্ষতিকর অণুজীব বা নির্ধারিত মানের ব্যত্যয় পাওয়া যায়। এর মধ্যে ছিল অতিরিক্ত প্রিজারভেটিভযুক্ত আমের আচার, ভুল মাত্রার দুধের কঠিন পদার্থযুক্ত আইসক্রিম এবং ক্ষতিকর অণুজীবযুক্ত লোশন ও শ্যাম্পু। এছাড়া, ২০২৬ সালের আগস্টে যশোরের কেশবপুরে ভেজাল ও নকল শিশু খাদ্য বিক্রির অপরাধে 'রিভা ফুড' নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই সময়ে, সাভার ও কেরানীগঞ্জে নকল বৈদ্যুতিক তার, ভেজাল শিশু খাদ্য ও কসমেটিকস উৎপাদন, মজুদ ও বিক্রির দায়ে ১২টি প্রতিষ্ঠানকে ২.৩ মিলিয়ন টাকা জরিমানা করে র‍্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। ২০২৫ সালের জুন মাসে ফতুল্লায় লাইসেন্সবিহীন শিশু খাদ্য উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠানকে ১ লাখ টাকা জরিমানা ও সিলগালা করা হয় এবং প্রায় ৫ লক্ষ টাকার মালামাল ধ্বংস করা হয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, ভেজাল চক্র কতটা সক্রিয় এবং এর ব্যাপকতা কতটা বিস্তৃত।

খাদ্যে ভেজালের এই সমস্যা কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বাজারে ৪০-৭০% খাবারেই কোনো না কোনো ধরনের ভেজাল রয়েছে। বিএসটিআই-এর মতো মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুর্বলতা, দুর্নীতি এবং পুরনো আইনি কাঠামো এর কার্যকারিতাকে ব্যাহত করছে। এমনকি, বিএসটিআই-এর নিজস্ব কার্যক্রমেও অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যা প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। প্রধানমন্ত্রীও খাদ্য ভেজাল রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। এই সংস্থাগুলো জনবল সংকট, অপর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা, আধুনিক সরঞ্জামের অভাব এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্মুখীন হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে।

বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একাধিক আইন ও বিধিমালা বিদ্যমান রয়েছে, যার মধ্যে 'নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩' এবং ১৯৭৪ সালের 'বিশেষ ক্ষমতা আইন' উল্লেখযোগ্য। এসব আইনে খাদ্যে ভেজালের জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং অবৈধভাবে মজুদ করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব এবং অভিযানগুলো দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলছে না। প্রায়শই দেখা যায়, অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিন পর পুরোনো অনিয়ম আবার ফিরে আসে। এর কারণ হলো, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে কার্যকর নজরদারি এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া, ভোক্তা অধিকার আইন, ২০০৯ এবং নিরাপদ খাদ্য আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব বলে মনে করা হয়।

ভেজাল খাদ্যের ব্যাপকতা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব ঘাতক। এটি ক্যান্সার, লিভার ও কিডনির সমস্যা, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ খাদ্যজনিত অসুস্থতায় ভোগেন, যা দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মতে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ কিডনি রোগী এবং ৪৫ লক্ষাধিক মানুষ ভেজাল ও দূষিত খাবার খেয়ে নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন এর কঠোর ও নিরবচ্ছিন্ন প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা।

সুপারিশ: খাদ্য ভেজাল রোধে বিএসটিআই এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অপরিহার্য: প্রথমত, বিএসটিআই-এর অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করতে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করে নিয়মিত নিরীক্ষা চালানো উচিত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিএসটিআই-এর ল্যাবরেটরি সুবিধা আধুনিকীকরণ, পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে। তৃতীয়ত, খাদ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ও অভিযানগুলোকে আরও সুসংহত ও দীর্ঘমেয়াদী করতে হবে, যাতে অভিযান শেষ হওয়ার পর পুনরায় অনিয়ম ফিরে আসতে না পারে। চতুর্থত, নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে বিধিমালা দ্রুত প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে এবং ভোক্তা কর্তৃক মামলা করার সময়সীমা বৃদ্ধি করে ৯০ দিন করা যেতে পারে। পঞ্চমত, জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ব্যাপক প্রচার অভিযান চালাতে হবে, যেখানে ভোক্তাদের ভেজাল পণ্য চিহ্নিত করার উপায় এবং বিএসটিআই-এর অনুমোদন চিহ্ন, লাইসেন্স নম্বর, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ যাচাই করার গুরুত্ব সম্পর্কে জানানো হবে। পরিশেষে, খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কঠোর নজরদারি এবং আন্তঃসংস্থা সমন্বয় জোরদার করতে হবে, যাতে ভেজালমুক্ত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।


🔎 অনুসন্ধানে: ফারজানা আহমেদ

ফারজানা আহমেদ, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: খাদ্য ভেজাল ও বিএসটিআই (BSTI) ওয়াচ।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator