সম্প্রতি, বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সংকটের প্রভাবে বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং খাত যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, তা এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে যে মন্থরতা পরিলক্ষিত হয়েছে, তা কেবল বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বিঘ্নের ফল নয়, বরং স্থানীয় চিপ উৎপাদন ও ডিজাইন সক্ষমতার অনুপস্থিতির এক সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। এই সংকট এমন এক সময়ে এসেছে যখন সরকার স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এবং ICT Division এর মাধ্যমে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তিগত ভিত্তি সুদৃঢ় করার চেষ্টা করছে। দেশের ইলেকট্রনিক্স বাজার, যা গত পাঁচ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং বার্ষিক ১৫-২০% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা মূলত অ্যাসেম্বলিং এবং সীমিত স্থানীয়করণ প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা চিপ সংকটের মতো বাহ্যিক অভিঘাতের সামনে শিল্পের ভঙ্গুরতা প্রকাশ করেছে।
এই সংকটের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স শিল্প মূলত আমদানি-নির্ভর অ্যাসেম্বলিং মডেলের উপর দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয়ভাবে চিপ ডিজাইন, ফ্যাব্রিকেশন এবং প্যাকেজিংয়ের কোনো বৃহৎ অবকাঠামো নেই। যদিও BASIS (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস) এর অধীনে কিছু স্টার্টআপ মাইক্রোকন্ট্রোলার ভিত্তিক পণ্য ডিজাইন নিয়ে কাজ করছে, তাদের সক্ষমতা এখনো অত্যন্ত সীমিত। BHTPA (বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ) এর আওতায় হাইটেক পার্কগুলোতে ইলেকট্রনিক্স অ্যাসেম্বলিং ইউনিট স্থাপন করা হলেও, মাদারবোর্ড, প্রসেসর, মেমরি চিপসহ গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর উপাদানগুলো এখনো সম্পূর্ণরূপে আমদানিনির্ভর। উদাহরণস্বরূপ, স্মার্টফোন ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে স্থানীয় মূল্য সংযোজন মূলত অ্যাসেম্বলিং এবং কিছু প্লাস্টিক কম্পোনেন্ট উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ। একটি স্মার্টফোনের মোট উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ৬০-৭০% চলে যায় সেমিকন্ডাক্টর ও অন্যান্য উচ্চপ্রযুক্তি উপাদান আমদানিতে। এই চিত্র স্থানীয়করণ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের অভাব এবং একটি টেকসই সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জগুলো ফুটিয়ে তোলে।
চিপ সংকটের এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগও তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাপী সেমিকন্ডাক্টর সাপ্লাই চেইনের পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে অনেক দেশই চীন নির্ভরতা কমাতে চাইছে এবং বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্রের সন্ধান করছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যদি সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন এবং ফ্যাব্রিকেশনের প্রাথমিক স্তরগুলোতে বিনিয়োগ করতে পারে, তবে তা দেশের ইলেকট্রনিক্স শিল্পের জন্য একটি গেম-চেঞ্জার হতে পারে। BTRC (বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন) এর স্মার্টফোন ও আইওটি ডিভাইসের স্থানীয় উৎপাদন নীতিমালায় কিছু প্রণোদনা দেওয়া হলেও, তা চিপ স্তরের গবেষণাকে উৎসাহিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। a2i (অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন) প্রোগ্রাম বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগকে সমর্থন দিলেও, সেমিকন্ডাক্টর গবেষণা ও উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট ও বৃহৎ পরিসরের প্রকল্প এখনো অনুপস্থিত। এই শিল্পে স্থানীয়করণ মানে শুধু অ্যাসেম্বলিং নয়, বরং ডিজাইন ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি (IP) তৈরি করা, ফ্যাব্রিকেশন ল্যাব স্থাপন করা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা। বর্তমানে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থাকলেও, সেমিকন্ডাক্টর ফিজিক্স, ডিজাইন অটোমেশন টুলস (EDA) এবং ভেরিফিকেশন টেকনিক্সে বিশেষায়িত গবেষণার অভাব প্রকট। এই শূন্যতা পূরণের জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতে সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।
| সূচক | ২০১৮-১৯ | ২০১৯-২০ | ২০২০-২১ | ২০২১-২২ | ২০২২-২৩ (প্রাক্কলিত) |
|---|---|---|---|---|---|
| ইলেকট্রনিক্স পণ্যের স্থানীয় বাজার (বিলিয়ন USD) | ৬.৫ | ৭.৮ | ৯.৫ | ১১.৮ | ১৩.৫ |
| ইলেকট্রনিক্স পণ্যের আমদানি নির্ভরতা (%) | ৮৫% | ৮২% | ৮০% | ৭৮% | ৭৯% |
| সেমিকন্ডাক্টর উপাদান আমদানি ব্যয় (মিলিয়ন USD) | ৪০০ | ৪৫০ | ৫২০ | ৬০০ | ৭২০ |
| স্থানীয়ভাবে ডিজাইনকৃত চিপ IP ব্যবহার (%) | <১% | <১% | <১% | <১% | <১% |
| হাইটেক পার্কে ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট | ৫ | ১০ | ১৫ | ২০ | ২৫ |
উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB), BHTPA, ICT Division এর বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ।
সুপারিশ
- ICT Division এর অধীনে একটি 'জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর গবেষণা ও উন্নয়ন ইনস্টিটিউট' প্রতিষ্ঠা করা, যা সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, ফ্যাব্রিকেশন এবং প্যাকেজিং প্রযুক্তির উপর বিশেষায়িত গবেষণা পরিচালনা করবে। এই ইনস্টিটিউটকে BHTPA এর হাইটেক পার্কগুলোতে গবেষণা ল্যাব স্থাপনের জন্য অগ্রাধিকারমূলক তহবিল এবং ট্যাক্স ইনসেনটিভ প্রদান করতে হবে, যাতে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হয়।
- BASIS এবং a2i এর সমন্বয়ে একটি 'সেমিকন্ডাক্টর স্টার্টআপ ইনকিউবেশন প্রোগ্রাম' চালু করা। এই প্রোগ্রামের আওতায় স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইলেকট্রনিক্স ও কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং স্নাতকদের সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন অটোমেশন (EDA) টুলস এবং ভেরিফিকেশন টেকনিক্সে প্রশিক্ষিত করে তোলা এবং তাদের উদ্ভাবনী চিপ ডিজাইন প্রকল্পগুলোতে প্রাথমিক তহবিল ও মেন্টরশিপ প্রদান করা। BTRC কে স্থানীয়ভাবে ডিজাইন করা সেমিকন্ডাক্টর ব্যবহারকারী টেলিকমিউনিকেশন ডিভাইসগুলোর জন্য বিশেষ লাইসেন্সিং সুবিধা প্রদান করতে হবে।
- সরকারকে 'বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব্রিকেশন নীতি ২০২৩' (প্রস্তাবিত) প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে স্থানীয় চিপ ফ্যাব্রিকেশন প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি, ১০ বছরের জন্য কর্পোরেট ট্যাক্স ছুটি এবং বিদ্যুতের ক্ষেত্রে বিশেষ ভর্তুকির মতো সুস্পষ্ট আর্থিক প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই নীতিমালায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য ল্যান্ড লিজিং এবং অবকাঠামোগত সহায়তার বিস্তারিত রূপরেখা থাকতে হবে, যা BHTPA এর মাধ্যমে কার্যকর করা হবে।