শেয়ারবাজারের ফ্লোর প্রাইস: দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি ও বিনিয়োগকারীর আস্থার সংকট | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

শেয়ারবাজারের ফ্লোর প্রাইস: দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি ও বিনিয়োগকারীর আস্থার সংকট

তানভীর আহমেদ  avatar   
তানভীর আহমেদ
শেয়ারবাজারের ফ্লোর প্রাইস: দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি ও বিনিয়োগকারীর আস্থার সংকট
শেয়ারবাজারের ফ্লোর প্রাইস: দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি ও বিনিয়োগকারীর আস্থার সংকট
ছবি: সংগৃহীত
মাত্র কয়েক মাস আগেও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE) এর টার্নওভার যখন দৈনিক গড়ে ৩০০-৪০০ কোটি টাকার নিচে নেমে এসেছিল, তখন বাংলাদ...

মাত্র কয়েক মাস আগেও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE) এর টার্নওভার যখন দৈনিক গড়ে ৩০০-৪০০ কোটি টাকার নিচে নেমে এসেছিল, তখন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক আরোপিত ফ্লোর প্রাইস নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়। সর্বশেষ ২০২২ সালের ২৯শে জুলাই ফ্লোর প্রাইস আরোপের পর থেকে বাজারের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ব্যাহত হয়েছে, যা একদিকে তারল্য সংকটকে তীব্র করেছে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ আটকে যাওয়ার কারণে তাদের আস্থায় বড় ধরনের চিড় ধরেছে। বাজারের প্রাকৃতিক ওঠানামাকে কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করার এই প্রচেষ্টা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে BSEC এর বারবার হস্তক্ষেপ বাজারের মৌলিক চাহিদা ও সরবরাহের নিয়মকে উপেক্ষা করেছে।

ফ্লোর প্রাইস ব্যবস্থা শেয়ারবাজারের তারল্য প্রবাহকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে, কারণ একটি নির্দিষ্ট মূল্যের নিচে শেয়ার বিক্রি করার সুযোগ না থাকায় অনেক বিনিয়োগকারী তাদের পোর্টফোলিও পুনর্বিন্যাস করতে পারছেন না। এর ফলে, বাজারের লেনদেন কমে যাচ্ছে এবং নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট হচ্ছে না, যা DSE এবং CSE উভয়কেই এক স্থবির অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্লোর প্রাইস আরোপের পর অনেক ব্লু-চিপ কোম্পানির শেয়ার, যা ঐতিহাসিকভাবে স্থিতিশীল ছিল, সেগুলোরও লেনদেন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, কারণ বিদ্যমান ফ্লোর প্রাইসে ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি শুধু বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি করছে না, বরং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ারের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়াকেও বাধা দিচ্ছে, যা পুঁজি উত্তোলনে তাদের ক্ষমতাকে সীমিত করছে।

বাজারের স্বাভাবিক কার্যকারিতা বিঘ্নিত হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। ফ্লোর প্রাইসকে একটি অস্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখা হলেও, এর দীর্ঘস্থায়ী প্রয়োগ বাজারের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যখন বিনিয়োগকারীরা দেখেন যে তাদের শেয়ার বিক্রি করার স্বাধীনতা নেই, তখন তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হন না। এটি CDBL (সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড) এ সংরক্ষিত শেয়ারগুলোর প্রকৃত মূল্য প্রতিফলনেও বাধা সৃষ্টি করছে, কারণ অনেক শেয়ারের বাজার মূল্য ফ্লোর প্রাইসের কারণে কৃত্রিমভাবে উচ্চ রাখা হয়েছে, যা বাস্তবসম্মত নয়। BSEC এর উচিত ছিল বাজারের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহকে সম্মান জানিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা অর্জনের দিকে মনোনিবেশ করা, কিন্তু ফ্লোর প্রাইসের বারবার প্রয়োগ এই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করেছে।

সূচক ফ্লোর প্রাইস আরোপের পূর্বে (জুলাই ২০২২) ফ্লোর প্রাইস আরোপের পরে (জানুয়ারি ২০২৩) ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার পরবর্তী (জুলাই ২০২৩)
দৈনিক গড় লেনদেন (DSE, কোটি টাকা) ৮৫০-১০০০ ৩০০-৪০০ ৫০০-৬৫০
ডিএসইএক্স সূচক ৬৩০০-৬৪০০ ৬২০০-৬৩০০ ৬৩০০-৬৪০০
বাজার মূলধন (DSE, লাখ কোটি টাকা) ৫.২০-৫.৩০ ৪.৮০-৪.৯০ ৪.৯০-৫.০০
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিও আটকে যাওয়া (% আনুমানিক) ১০-১৫% ৬০-৭০% ৫০-৬০%

উৎস: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর মাসিক প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কে অবশ্যই 'সিকিউরিটিজ আইন, ১৯২০' এবং 'সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩' এর অধীনে বাজারের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে ফ্লোর প্রাইসের মতো কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করতে হবে এবং শুধুমাত্র চরম অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য তা প্রয়োগ করার নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
  • DSE এবং CSE কে বাজারের স্বচ্ছতা ও তারল্য বৃদ্ধির জন্য নতুন আর্থিক পণ্য যেমন ডেরিভেটিভস, শর্ট সেলিং এবং বন্ড মার্কেট সক্রিয় করতে হবে, যা 'সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯' এর আলোকে বিনিয়োগকারীদের বৈচিত্র্যপূর্ণ বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে এবং বাজারের প্রাকৃতিক চাহিদা-সরবরাহ প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে।
  • CDBL কে শক্তিশালী করে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কর্পোরেট গভর্ন্যান্স এবং তথ্য প্রকাশের মান উন্নত করার জন্য BSEC এর কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে 'কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কোড, ২০১৮' এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয় এবং বিনিয়োগকারীরা সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদী আস্থার ভিত্তি তৈরি করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানভীর আহমেদ

তানভীর আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শেয়ারবাজার ও ক্যাপিটাল মার্কেট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator