অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি

অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

শাহেদ করিম  avatar   
শাহেদ করিম
অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে (UN Peacekeeping) দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ক্রমাগত অংশগ্রহণ হ্রাস এবং নতুন ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক নির...

সম্প্রতি, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে (UN Peacekeeping) দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ক্রমাগত অংশগ্রহণ হ্রাস এবং নতুন ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিগত এক দশকে, বিশেষ করে ২০১৮ সাল থেকে, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে দক্ষিণ এশীয় শান্তিরক্ষীদের মোতায়েনের সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের পেছনে কেবল নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রথাগত কারণগুলোই নয়, বরং চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI) এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশল (Indo-Pacific Strategy)-এর মতো বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতামূলক এজেন্ডাগুলোও প্রভাব ফেলছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোর নীতি নির্ধারণে এই বহুমাত্রিক চাপ স্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং একই বছর নেপালের সাথে ভারতের সীমান্ত বিরোধ, যা পরবর্তীতে দু'দেশের সম্পর্কে শীতলতা এনেছিল, তা আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির জটিলতাকেই তুলে ধরে।

এই অঞ্চলের দেশগুলো একদিকে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে, অন্যদিকে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর টানাপোড়েনের মধ্যে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে হিমশিম খাচ্ছে। বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগের সুযোগ গ্রহণ করলেও, এর দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব নিয়ে সতর্ক। বিশেষত, ঋণের ফাঁদ এবং সার্বভৌমত্বের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা চলছে। এই বিনিয়োগগুলো প্রায়শই অস্বচ্ছ চুক্তি এবং স্থানীয় শ্রমবাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা জনমনে অসন্তোষ তৈরি করে। অন্যদিকে, ভারত তার 'প্রতিবেশী প্রথম' (Neighbourhood First) নীতির মাধ্যমে আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, তবে এটি প্রায়শই চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের পাল্টা জবাব হিসেবে দেখা হয়, যা ছোট দেশগুলোকে দুই শক্তির মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখতে বাধ্য করে। উদাহরণস্বরূপ, ভুটান ও মালদ্বীপের মতো ক্ষুদ্র দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উভয় বৃহৎ শক্তির সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে, যা তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। এই দ্বিমুখী চাপ আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতাকেও প্রভাবিত করছে, যেমন সার্ক (SAARC) গত কয়েক বছর ধরে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে, যার প্রধান কারণ ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার চলমান বিরোধ।

সার্ক-এর নিষ্ক্রিয়তা আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামোতে একটি বড় শূন্যতা তৈরি করেছে, যা BIMSTEC (Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation)-কে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। তবে BIMSTEC-ও তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারেনি, মূলত সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতৈক্যের অভাব এবং বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করছে। ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ভুটান ও নেপালকে নিয়ে গঠিত BIMSTEC-এর লক্ষ্য ছিল বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করা। কিন্তু সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, সীমান্ত বিরোধ এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব BIMSTEC-এর কার্যকারিতাকে সীমিত করে দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক সামরিক অভ্যুত্থান এবং রোহিঙ্গা সংকট BIMSTEC-এর এজেন্ডাকে জটিল করে তুলেছে, যেখানে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে, আঞ্চলিক দেশগুলো প্রায়শই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যা সামগ্রিকভাবে একটি সমন্বিত আঞ্চলিক কাঠামোর অনুপস্থিতি প্রকট করে তুলছে। এর ফলে, জলবায়ু পরিবর্তন, সন্ত্রাসবাদ ও সাইবার নিরাপত্তার মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মের অভাব দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

সাল জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দক্ষিণ এশীয় সৈন্য অবদান (শীর্ষ ৫ দেশ, মোট) সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত BIMSTEC শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের BRI বিনিয়োগ (আনুমানিক বিলিয়ন USD)
২০০৫ ৬৭,৪১৭ (বাংলাদেশ: ১০,০২৯, পাকিস্তান: ১০,০৪৯, ভারত: ৯,১৫০) ১৩তম (ঢাকা, বাংলাদেশ) ১ম (ব্যাংকক, থাইল্যান্ড) ১.৫
২০১০ ৭২,৩৩৫ (পাকিস্তান: ১০,৭৩০, বাংলাদেশ: ৯,৯২২, ভারত: ৮,৯৩৪) ১৬তম (থিম্পু, ভুটান) ২য় (নেপিডো, মিয়ানমার) ৪.২
২০১৫ ৭৬,৯১২ (বাংলাদেশ: ৯,৫৭৬, ভারত: ৭,৭৯৭, পাকিস্তান: ৭,৫৬১) ১৮তম (কাঠমান্ডু, নেপাল) ৩য় (নেপিডো, মিয়ানমার) ১২.৮
২০২০ ৬১,১২১ (বাংলাদেশ: ৬,৭৩৫, ভারত: ৫,৩৭৫, নেপাল: ৫,১৪৭) অনুষ্ঠিত হয়নি অনলাইন রিট্রিট ২৫.৫
২০২৩ ৫৬,৮০৩ (বাংলাদেশ: ৬,৫২৭, নেপাল: ৬,২৬৪, ভারত: ৫,৮৭৫) অনুষ্ঠিত হয়নি ৫ম (কলম্বো, শ্রীলঙ্কা) ৩১.২

উৎস: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বিভাগ (DPKO/DPO), সার্ক সচিবালয়, BIMSTEC সচিবালয়, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB), চায়না গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট ট্র্যাকার (AEI)।

সুপারিশ

  • দক্ষিণ এশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোকে সম্মিলিতভাবে একটি 'আঞ্চলিক সংকট ব্যবস্থাপনা প্রোটোকল' (Regional Crisis Management Protocol) তৈরি ও কার্যকর করতে হবে, যা সার্ক বা BIMSTEC-এর কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই প্রোটোকল অনুযায়ী, আঞ্চলিক সংঘাত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান এবং সমন্বিত ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা বাধ্যতামূলক করা হবে, যেখানে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট ভূমিকা ও দায়িত্ব সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে।
  • BIMSTEC-এর কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোকে একটি 'BIMSTEC বিনিয়োগ ও অবকাঠামো তহবিল' (BIMSTEC Investment and Infrastructure Fund) গঠন করতে হবে। এই তহবিল সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা অর্থ দিয়ে পরিচালিত হবে, যা চীন বা অন্য কোনো একক বৃহৎ শক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বচ্ছ ও টেকসই আঞ্চলিক অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।
  • জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়গুলোকে একত্রিত হয়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বিভাগ (DPKO/DPO)-এর সাথে একটি 'দক্ষিণ এশিয়া নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব চুক্তি' (South Asia Security Partnership Agreement) স্বাক্ষর করতে হবে। এই চুক্তির আওতায় শান্তিরক্ষীদের উন্নত প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ এবং ঝুঁকির মুখে থাকা মিশনে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যা তাদের আন্তর্জাতিক ভূমিকা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাহেদ করিম

শাহেদ করিম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator