দেশজুড়ে চলমান তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে গণপরিবহন খাত এক ভয়াবহ স্থবিরতার মুখে পড়েছে, যা রাজধানী থেকে মফস্বল পর্যন্ত প্রতিটি রুটে প্রকট আকার ধারণ করেছে। গত কয়েক দিন ধরে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ লাইন আর চালকদের হাহাকার নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে। মূলত গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি এবং স্টেশনগুলোর অব্যবস্থাপনার কারণে চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পরিবহন সময়সূচির ওপর। এই সংকট কেবল দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর নেপথ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে এক শ্রেণির অসাধু চক্র, যারা টোকেন বাণিজ্যের মাধ্যমে সাধারণ চালকদের জিম্মি করে ফেলেছে। নিয়ম অনুযায়ী সিরিয়াল মেনে গ্যাস পাওয়ার কথা থাকলেও, ফিলিং স্টেশনের কিছু অসাধু কর্মীর যোগসাজশে বাড়তি অর্থের বিনিময়ে টোকেন কেনাবেচা হচ্ছে, যা পরিবহন খাতে এক নতুন নৈরাজ্যের জন্ম দিয়েছে।
ভুক্তভোগী চালকদের অভিযোগ, দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস স্টেশনের লাইনে ব্যয় হওয়ায় তারা নির্ধারিত ট্রিপ সম্পন্ন করতে পারছেন না, ফলে তাদের দৈনিক আয়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পরিবহন চালক জানান, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক সময় গ্যাসের দেখা মিলছে না, আবার লাইনের সামনের দিকে জায়গা পেতে স্টেশন সংশ্লিষ্টদের হাতে অবৈধভাবে টাকা তুলে দিতে হচ্ছে। এই টোকেন বাণিজ্যের শিকার হয়ে সাধারণ চালকরা দিশেহারা হয়ে পড়ছেন এবং পরিস্থিতির শিকার হয়ে অনেক চালক বাধ্য হয়েই যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন। যাত্রীদের অভিযোগ, পরিবহন সংকটের সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু চালক নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ পর্যন্ত অর্থ দাবি করছেন, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। রুট ডাইনামিক্সে এই বিশৃঙ্খলা যাত্রীদের সময় ও অর্থের অপচয় বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।
সংশ্লিষ্ট ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ এবং বাস মালিক সমিতি এই সংকটের জন্য একে অপরকে দায়ী করলেও বাস্তবে কোনো সমাধান দৃশ্যমান হচ্ছে না। স্টেশনগুলোর দাবি, গ্যাস সরবরাহ পর্যাপ্ত না থাকায় তারা হিমশিম খাচ্ছেন এবং লাইনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে টোকেন বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে তারা বরাবরই দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন। প্রশাসনিক নজরদারির অভাব এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে এই অনিয়ম আরও জেঁকে বসছে। পরিবহন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলের মতে, কেবল গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি করলেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, বরং প্রতিটি স্টেশনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং টোকেন বাণিজ্যের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সাথে নিয়ে প্রশাসনকে জরুরি ভিত্তিতে তদারকি কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
পরিবহন খাতে সৃষ্ট এই সংকট যদি দ্রুত নিরসন করা না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইন এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে। গ্যাস সংকটের নামে গড়ে ওঠা এই কৃত্রিম অস্থিরতা কেবল যাত্রী ভোগান্তিই বাড়াচ্ছে না, বরং এটি দেশের সামগ্রিক পরিবহন অর্থনীতির ওপর এক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সাধারণ যাত্রীরা এখন কর্তৃপক্ষের দ্রুত এবং কার্যকর হস্তক্ষেপে দীর্ঘ লাইনের ভোগান্তি ও টোকেন বাণিজ্যের অবসান চায়। পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে কোনো অসাধু চক্র সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে পকেট ভারী করার সুযোগ না পায়।