নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন: শিক্ষকদের অপ্রস্তুতি নাকি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন: শিক্ষকদের অপ্রস্তুতি নাকি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব?

কাজী মাকসুদুল হক  avatar   
কাজী মাকসুদুল হক
নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন: শিক্ষকদের অপ্রস্তুতি নাকি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব?
নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন: শিক্ষকদের অপ্রস্তুতি নাকি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব?
ছবি: সংগৃহীত
২০২৩ শিক্ষাবর্ষে প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে এবং ২০২৪ শিক্ষাবর্ষে দ্বিতীয়, তৃতীয়, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রমের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন শুরু হলেও, শ...

২০২৩ শিক্ষাবর্ষে প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে এবং ২০২৪ শিক্ষাবর্ষে দ্বিতীয়, তৃতীয়, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রমের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন শুরু হলেও, শিক্ষকদের প্রস্তুতি নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৪০% শিক্ষক মনে করেন, নতুন কারিকুলামের মূল দর্শন ও পদ্ধতিগত দিক সম্পর্কে তাদের সুস্পষ্ট ধারণা নেই। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক প্রণীত এই যুগান্তকারী পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের মুখস্থ নির্ভরতা কমিয়ে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখনকে প্রাধান্য দিলেও, মাঠ পর্যায়ে এর সুফল পেতে হলে শিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্থ দপ্তরগুলো যেমন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) নিয়মিত প্রশিক্ষণের আয়োজন করলেও, শিক্ষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন এই প্রশিক্ষণগুলো পর্যাপ্ত বা কার্যকর নয়। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে নতুন পদ্ধতির সুবিধা পুরোপুরি পাচ্ছে না, যা কারিকুলামের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত করছে।

শিক্ষকদের অপ্রস্তুতি বা প্রশিক্ষণের অভাবের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে প্রশিক্ষণের সময়কাল ও গুণগত মান। অনেক শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, যে প্রশিক্ষণগুলো তারা পেয়েছেন, সেগুলোর সময়কাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত, প্রায়শই ৩-৫ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই স্বল্প সময়ে নতুন শিক্ষাক্রমের মতো একটি জটিল বিষয়, যার মধ্যে রয়েছে শিখনফলভিত্তিক মূল্যায়ন, অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন-শেখানো কৌশল, এবং বিষয়ভিত্তিক সমন্বয় সাধন — এসব আত্মস্থ করা কঠিন। এছাড়া, প্রশিক্ষক নির্বাচন এবং প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তুর আধুনিকায়নেও ঘাটতি দেখা গেছে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর তাদের পলিটেকনিক শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির আয়োজন করলেও, সাধারণ শিক্ষা ধারার শিক্ষকদের জন্য এমন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের অভাব পরিলক্ষিত হয়। এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে শিক্ষকদের কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান প্রদান করা হয়, হাতে-কলমে অনুশীলন এবং শ্রেণিকক্ষে নতুন পদ্ধতি প্রয়োগের ব্যবহারিক দিকগুলো প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে। BANBEIS এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক শিক্ষককে নতুন কারিকুলামের আওতায় আনা হয়েছে, কিন্তু তাদের প্রত্যেকের জন্য মানসম্মত ও ফলপ্রসূ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ।

প্রশিক্ষণের অপর্যাপ্ততা শিক্ষকদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব তৈরি করছে, যার ফলে তারা শ্রেণিকক্ষে নতুন কারিকুলামের নির্দেশনাগুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করতে পারছেন না। বিশেষত, শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্স অ্যাসেসমেন্ট বা যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নতুন কারিকুলামে প্রচলিত পরীক্ষার পরিবর্তে ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং পারদর্শিতার নির্দেশক (Performance Indicators) ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অনেক শিক্ষকই এই সূক্ষ্ম মূল্যায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন না। এর ফলে, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত যোগ্যতা সঠিকভাবে নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং ফলাফল বিশ্লেষণও ত্রুটিপূর্ণ হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মানোন্নয়নে তাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা সীমিত। অথচ, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের মানসম্মত প্রবেশ নিশ্চিত করতে হলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরেই গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। NSDA (জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) দেশের শ্রমশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করলেও, শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে তাদের সরাসরি কোনো বৃহৎ প্রকল্প নেই, যা এই খাতের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

বছর নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়িত শ্রেণি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক (আনুমানিক) শিক্ষকদের সন্তুষ্টি (%) প্রশিক্ষণ সময়কাল (গড়)
২০২৩ ১ম, ৬ষ্ঠ, ৭ম ২,৫০,০০০ ৫০% ৩-৫ দিন
২০২৪ ২য়, ৩য়, ৮ম, ৯ম ২,৮০,০০০ ৪৫% ৩-৫ দিন
২০২৫ (প্রস্তাবিত) ৪র্থ, ৫ম, ১০ম ৩,০০,০০০ লক্ষ্যমাত্রা: ৭০% ৭-১০ দিন

উৎস: শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাউশি ও নেপ-এর বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত।

সুপারিশ

  • শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এর আলোকে শিক্ষকদের জন্য একটি সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদী ও ফলপ্রসূ পেশাগত উন্নয়ন কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে প্রতি বছর অন্তত ৩০-৪০ দিনের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হবে এবং প্রশিক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
  • BANBEIS এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে যৌথভাবে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে, যেখানে নতুন কারিকুলামের প্রতিটি বিষয়ের জন্য ভিডিও টিউটোরিয়াল, অনলাইন মডিউল এবং শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত অনলাইন ফোরাম থাকবে, যা শিক্ষকদের যেকোনো সময় নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করবে।
  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে (মাউশি) শিক্ষকদের জন্য 'শিক্ষক দক্ষতা উন্নয়ন সনদ' (Teacher Skill Development Certificate) চালু করতে হবে, যা নতুন কারিকুলামের ওপর নির্দিষ্ট দক্ষতার ভিত্তিতে প্রদান করা হবে এবং এই সনদ শিক্ষকদের পদোন্নতি ও ইনসেনটিভের সাথে সংযুক্ত করে পেশাগত উৎকর্ষ সাধনে উৎসাহিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কাজী মাকসুদুল হক

কাজী মাকসুদুল হক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator