জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের বিপর্যয়: উৎপাদন অচল, জনজীবনে চরম ভোগান্তি | আই নিউজ বিডি

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের বিপর্যয়: উৎপাদন অচল, জনজীবনে চরম ভোগান্তি..

Mohammad mojnu sarkar avatar   
Mohammad mojnu sarkar
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের বিপর্যয়: উৎপাদন অচল, জনজীবনে চরম ভোগান্তি..
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের বিপর্যয়: উৎপাদন অচল, জনজীবনে চরম ভোগান্তি..
ছবি: সংগৃহীত
দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প উৎপাদন মুখ থুবড়ে পড়েছে এবং আবাসিক গ্রাহকরা রান্নাবান্নার সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।..

দেশজুড়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার নজিরবিহীন বিপর্যয়ে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। তীব্র দাবদাহের মধ্যে একদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং, অন্যদিকে রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকটে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ কম, যার ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অর্ধেকের বেশি উৎপাদনক্ষমতা অকেজো হয়ে আছে। বর্তমানে দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াট হলেও, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে সর্বোচ্চ ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। এই ঘাটতির ফলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা মূলত শিল্পকারখানা ও আবাসিক এলাকায় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ব্যর্থ হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে টেক্সটাইল, নিটিং ও ডাইং কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে, যা দেশের রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গাজীপুরের একটি নিটওয়্যার কারখানার তথ্যমতে, আগে দৈনিক ২৬ টন কাপড় উৎপাদন হলেও বর্তমানে তা ১২ টনে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, সদস্যভুক্ত প্রায় ৭০ শতাংশ কারখানা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে চরম ক্ষতির সম্মুখীন। একদিকে গ্যাস সংকটের কারণে মেশিনারিজ সচল রাখা যাচ্ছে না, অন্যদিকে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটছে। এছাড়া আবাসিক গ্রাহকদের অভিযোগ, দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাসের চুলা জ্বলছে না, ফলে বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার গ্যাস বা মাটির চুলার শরণাপন্ন হতে হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও ভোগান্তি উভয়ই বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সংকট নিরসনে জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে শিল্পকারখানার বরাদ্দ কমিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহের চেষ্টা করা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল মিলছে না। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এই সংকটের জন্য পূর্ববর্তী সরকারের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন। পাশাপাশি, অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চার্জিং পয়েন্টগুলোতে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদাকে বর্তমান লোডশেডিংয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি। মন্ত্রী জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল সচল না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা কঠিন। এছাড়া আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের মতো সার কারখানাগুলোতেও চাহিদার মাত্র ৩৮ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে, যার ফলে মাসিক ১০০ কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটিকে।

সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্যাস উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা এবং এলএনজি আমদানিতে দীর্ঘসূত্রতা জাতীয় অর্থনীতিকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার ফলে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের ওপর যে প্রভাব পড়ছে, তা দীর্ঘমেয়াদী সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করতে না পারা এবং অন্যদিকে গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে আসা—এই দুইয়ের চাপে সাধারণ মানুষ ও শিল্পোদ্যোক্তারা উভয়ই কোণঠাসা। যদি দ্রুত বিকল্প জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করা না যায় এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিতরণে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করা না হয়, তবে এই সংকট দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে আরও দুর্বল করে তুলবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।

No comments found


News Card Generator